https://sylhet24.net/home/news_description/7347

সাম্প্রতিক সময়ের ভাবনা ও হেফাজত আলোচনা

প্রসারিত করো ছোট করা পরবর্তীতে পড়ুন Print

ইয়াকুব শাহরিয়ার

মানুষের এখন যে জিনিসগুলো খুব বেশি দরকার তা হলো: খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক মুক্তি। এগুলো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হলে তবেই শান্তিতে থাকবেন সাধারণ মানুষ। একটি গতিক জীবন ধারা ছিলো মানুষের। অর্থনৈতিকভাবে খুব দ্রুত সমৃদ্ধির দিকে হাঁটছিলো প্রিয় স্বদেশ। বাড়ছিলো কর্মসংস্থান, উদ্যমী হচ্ছিলেন আমাদের তরুণ শক্তিদল। সবকিছুকে হঠাৎ করে কার্যত শাটডাউন করে দিয়েছে নোভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। থমকে গিয়েছে পৃথিবী; থেমে আছে বাংলাদেশও। স্বাভাবিকভাবেই যেটা হওয়ার কথা সেটাই হয়েছে। মানুষ পড়েছে মহাবিপদে। তার মাঝখানে হেফাজতে ইসলাম নিয়ে সরগরম আলোচনা। এসব বিষয় নিয়েই আজকের নিবন্ধ।
দুই.
মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েছে। আমি কথাটি আরেকটু বুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করছি। খাদ্য সংকট বলতে এটা বুঝাতে চাইনি যে, মানুষ না খেয়ে মরেছে। বলতে চাইছি- টানা লকডাউনে উৎপাদন বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় পণ্যের দাম বেড়েছে চূড়ান্ত। এ সরকার ক্ষমতায় আসবার আগে ও পরে একটি প্রচারণা তারা ব্যপকভাবে করেছেন যে, দ্রব্যমূল্যের দাম কম থাকবে। চালের দাম শুধুমাত্র হাতের নাগালেই থাকবেনা, দশ টাকা কেজিতে বিক্রি হবে। সেটা বেশ কিছুদিন হয়েছেও। ধারাবাহিকতা আর থাকেনি। বাজারে চালসহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর দাম এখন লাগামহীন। যদি বলি অতি দরিদ্রদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সুমতি পাঠকরা আমার সাথে বোধহয় একমত হবেন। তবে, সরকারের বড় সাফল্য এটা যে, প্রত্যেকটা মানুষকে কর্মক্ষম করে তুলতে চাইছে। অতিমারি করোনা না হলে এতোদিনে হয়তো আমাদের দেশটাকে অন্য উঁচ্চতায় দেখতে পেতাম।
তিন.
শিক্ষার বিষয়টি অতিব সংবেদনশীল, মর্মস্পর্শী ও হৃদয় বিদারক! হৃদয় বিদারক বলছি এজন্য যে, আগামী একটি প্রজন্ম আমরা পেতে যাচ্ছি যা মেধাহীন। সার্টিফিকেট থাকবে অথচ সে সার্টিফিকেটের কোনো মূল্যই থাকবে না! হাস্যকর একটা বিচ্ছিরি ব্যপার। এটাও করোনার কারণে হয়েছে। এযাবৎকালে আমরা যে বিষয়টি সহজভাবে খেয়াল করেছি- সরকার লক্ষ টাকা বেতন দিয়ে যেসব উচ্চ মেধাসম্পন্ন প্রাণিদের পোষছেন তারা শিক্ষায় খুব একটা ভালো পরামর্শ দিতে পারেননি। পক্ষান্তরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আপ্রাণ চেষ্টা করেও শিক্ষাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর আমরা এই ১৪ মাসে শিক্ষাটাকে একেবারেই কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে। এখানে চাইলে আরও ভালো কিছু করতে পারতো শিক্ষা বিভাগ। আমরা মফস্বল এলাকার মানুষ। গ্রামীণ বিষয় স্বচক্ষে দেখি। সরকারে অনেক গুণি মানুষ আছেন সেটা ভালো করেই জানি। আশা করছি দেশের সকল শিক্ষার্থীর কথা ভেবে সরকার একটা ভালো সিদ্ধান্তই নেবেন ঈদের পরে। গ্রামের অনেক মানুষ কিংবা শিক্ষার্থীর সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা সকলেই চাইছেন- সব দিক বিবেচনায় এনে শিক্ষাটাকে কীভাবে ‘ফ্রুটফুলি’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করা। এভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে থামিয়ে রেখে খুব একটা ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলে আর কী হবে। শিক্ষার মূল শেখড়টাই তো নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক মেধাবি শিশু বিভিন্নভাবে কর্নভার্ট হয়ে গিয়েছেন। ডিজিটালাইজেশনের অপশক্তির দিকে ঝুঁকেছেন অধিকাংশ ‘টিন এজ’ শিক্ষার্থী। নিরাপদ ইন্টারনেট না থাকায় লকডাউন কিংবা অবসরের এই সময়ে তারা বিপথগামী হচ্ছেন। নিশ্চিত ডুবতে যাওয়া এ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে আমাদেরকেই।
চার.
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, এই অতিমারির সময়ে আমাদের খাদ্যের চেয়ে আগে দরকার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। মন্ত্রীদের বলতে শুনি- সমস্ত ঢাকা শহরকে হাসপাতাল বানালেও কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাবে না। তাহলে আমরা আর কীভাবে আশ্বস্থ হতে পারি! আমাদের দূর্বলতা কতটুকু এটা বুঝতে আর কী-ই বা বাকী। সেদিন একটা ভিডিও আমার ফেসবুকে শেয়ার করেছি। হাসপাতালে বেড নাই, তাই রোগীকে এ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হচ্ছে না। চোখের সামনেই জীবিত মানুষটি মারা গেলো। স্বজনদের আহাজারি আর দর্শকদের আফসোস করা ছাড়া কোনো কিছুই করার ছিলো না। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সংবাদ শিরোনাম দেখে চোখটা আটকে গেলো৷ ৩১ কোটি টাকার করোনা হাসপাতাল উধাও! ব্যাপারটা কিছু বুঝা গেলো? ৩১ কোটি টাকা! কর্তৃপক্ষের দায়সারা বক্তব্য। তারপর আলোচনা বন্ধ! এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আর কী বলারই বা আছে। আমরা যাই করি, আমাদের তো আগে বাঁচতে হবে? বাঁচার জন্যে যে মৌলিক চাহিদাগুলো আমার দরকার তা আগে নিশ্চিত করার প্রয়োজন তো অবশ্যই আছে। তবে, এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে, সরকারের দ্রুত প্রচেষ্টায় আমরা বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশকে পেচনে ফেলে কোভিড-১৯ প্রতিরোধক টিকা গ্রহণ করেছি। এখন পরিস্থিতি বেশামালের দিকে। কার্যকর পদক্ষেপ এমনভাবে নিতে হবে- যেনো সাপও মরে, লাটিও বাঁচে।
পাঁচ.
মানুষের হাতে কাজ থাকলেই টাকা থাকবে। কর্মসংস্থান বন্ধ করে কোভিডের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আবার ক্ষুধায় মরুক এমনটা যেনো না হয়। যেহেতু করোনা ভাইরাসকে নিয়ে আমাদের চলতেই হবে সেহেতু, কার্যকর স্বাস্থ্যবিধি মানবার নীতিমালা প্রণয়ন করে কর্মস্থল খোলে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ বলে মনে করছি। একজন বাস চালককে আমি খুব ভালো করে চিনি। তিনি ভাড়ায় বাস চালিয়ে সংসার চালান। লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়ায় বৈশাখে হাওরে ধান কাটছেন। হঠাৎ করে বেশি পরিশ্রমের কাজে যাওয়ায় অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন। ৩ মেয়ে ১ ছেলে নিয়ে ৭জনের সংসারে এখন চরম টানাপোড়েন। তার এখন কাজ দরকার। এমন অসংখ্য চালক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন। তাদেরকে আগে অর্থনৈতিকভাবে আপাতত মুক্তি দেওয়া উচিত। পেটের ক্ষিধায় মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে। লকডাউন কার্যত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পুলিশের লাটিপেটা খেয়েও দোকানপাট খোলা শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের কথা একটু ভাবতে হবে।
শেষ.

২৫/২৬ মার্চ থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আলোচনায় শীর্ষে। নানান ঘটন-অঘটনে বার বারই ধর্মভিত্তিক এ দলটি উঠে আসছে আলোচনায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন, সর্বশেষ দলটির যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হককে নিয়ে তুমুল লঙ্কাকাণ্ড! যেহেতু হেফাজতে ইসলাম সাংবিধানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নয় সেহেতু প্রত্যেকটা বিষয়ে আলোচনার দরজা প্রশ্নাতীতভাবে খোলা ছিলো। সব বিষয়েই সরকার-হেফাজতে ইসলাম দু’দলই আলোচনা করতে পারতেন। অন্যদিকে,  আন্দোলনের শুরু থেকেই মাঠে নেমে আক্রমণাত্মক হয়ে তারা তাদের খেই হারিয়েছে। মোদির আগমন ভালোভাবে নেয়নি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। মোদি না আসার ব্যপারে তাদের ধর্মীয় অনেক যুক্তি তারা দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে মোদিকে নিয়ে এসেছেন। সরকার সেটা করতেই পারেন, এটা রাষ্ট্রীয় বিষয়- ব্যক্তি মোদী নন। তাই- এখানে হেফাজতে ইসলামের আরেকটু সংবেদনশীল হওয়া দরকার ছিলো। আল্লামা মামুনুল হককে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। হ্যাঁ, সেটা ব্যক্তিগত। তবে, বিষয় ব্যক্তগত হলেও ব্যক্তি যখন সামগ্রিক হয়ে যান তখন চলাচলের ক্ষেত্রে একটু চালাক হতে হয়। একটু চালাক না হলে এমন দশা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক



Editor: Mohammad Shakir Hossain

122 Albert Road, London,UK