রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

বাবরি মসজিদ বিতর্কের ‘রাজনৈতিক’ অবসান



images

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খুব ভাগ্যবান। গুজরাটের সফলকাম মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তিনি আজ প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন দক্ষ, কৌশলী ও পটু; তেমনি কট্টর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা এবং তাদের সহযোগীদের নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিকেও শীর্ষ আসনে বসাতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিপক্ষ দলগুলোকে সাইজআপ করে ফেলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাঝনদীতে ভাসছেন; তীরে ভিড়তে পারছেন না। রাহুল গান্ধী কংগ্রেস সভাপতির পদে ইস্তফা দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। মা সোনিয়া গান্ধী বিনা তেলে প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করছেন। মোদি দক্ষিণ ভারতের বিরোধী নেতাদের রেখেছেন দৌড়ের ওপর। উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও উড়িষ্যা রয়েছে নিজের কবজায়। মহারাষ্ট্রে বাজছে বিজেপির জয়গান। আর কমিউনিস্টরা ভাবছেন, ঠেলার নাম বাবাজি। অতএব তারাও নিশ্চুপ। চীনের সঙ্গে দহরম-মহরম করে পাকিস্তানকে এমনভাবে নাস্তানাবুদ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। যে কোনো সময় তার তখ্‌ত উল্টে যেতে পারে। নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার কিংবা বাংলাদেশ নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক রয়েছে। বলতে গেলে, তিনি এখন এ অঞ্চলের একচ্ছত্র নেতা। অতএব তিনি যদি ধরাকে সরা জ্ঞান করেন, তাহলে অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি ইস্পাতকঠোর। গত শতকের আশির দশকে ভারতীয় জনতা পার্টিসহ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা এবং তাদের সহযোগীরা যা যা পরিকল্পনা করেছিল; ক্ষমতার দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি একে একে সেগুলো বাস্তবায়ন করছেন। মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন। এর মাস কয়েকের মধ্যেই স্পর্শকাতর বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে মোদি আবার প্রমাণ করলেন- তার সরকারের হাত অনেক লম্বা। এই হাত ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রামমন্দির তৈরি হবে অযোধ্যায়, যেখানে আগে ছিল বাবরি মসজিদ। শনিবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এই বিতর্কের আপাতত অবসান ঘটেছে। আদালত সরকারকে এই মন্দির তৈরির জন্য তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্ট গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। রামমন্দির নির্মাণ কাজের দেখভাল করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এই মন্দির নির্মাণের কাজে ৩০ বছর আগেই হাত লাগিয়েছিলেন বর্তমান নরেন্দ্র মোদি। একসময় সংঘের সক্রিয় কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সেই সময় দেশজুড়ে রামমন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে রথযাত্রা শুরু করেন তৎকালীন বিজেপি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদভানি। সেই যাত্রার প্রথমভাগ ভালোভাবে শেষ করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তিনিই শান্তির বাণী উচ্চারণ করছেন।

রামমন্দির আন্দোলন নিছক ধর্মীয় ছিল না; ছিল সম্পূূর্ণ রাজনৈতিক। এর পর লোকসভায় লাফে লাফে বিজেপির আসন সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করেন, ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবির পরই আরএসএস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ) রামমন্দির আন্দোলনের কথা ভাবতে থাকে। তারা দাবি করতে শুরু করে, ষোড়শ শতকে একটি মন্দির ভেঙে তার ওপর তৈরি করা হয় বাবরি মসজিদ। ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় এ আন্দোলনের ফলে বিজেপির চলার পথ মসৃণ হয়; জনসমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। মাত্র দু’জন এমপি কংগ্রেসকে টক্কর দেয়। শুধু তাই নয়, ১৯৯৮ সালে সরকার গঠন করে প্রথম অ-কংগ্রেসি দল হিসেবে পাঁচ বছর পূর্ণ করে। ১৯৮৯ সালে রামমন্দিরের পালে হাওয়া লাগিয়ে ৮৯টি আসন দখল করে বিজেপি। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯০ সালে আদভানি গুজরাটের সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। আর তখন থেকেই রামমন্দির আন্দোলনের সঙ্গে তিনি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে যান। সেই সময় মোদি বিজেপির নির্বাচনী কমিটির সদস্য ছিলেন। তখন সোমনাথ থেকে মুম্বাই পর্যন্ত সেই রথযাত্রার দায়িত্বেও ছিলেন মোদি। ২০০২ সালে করসেবকদের একটি ট্রেনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলে তাতে মারা যান ৫৯ করসেবক। এর পর গুজরাটজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জেরে প্রাণ হারান শতাধিক লোক। সেই সময় নিষ্ফ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর, যা পরবর্তীকালে বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে কাজে লাগায় বারবার। ২০০৫ সালে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান মলয়কৃষ্ণ ধর তার এক বইতে দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), বিজেপি ও ভিএইচপির (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) নেতারা ইমারতটি (বাবরি মসজিদ) গুঁড়িয়ে দেওয়ার ১০ মাস আগেই এটি ভাঙার পরিকল্পনা করেছিল। বইটিতে ইস্যুটির ব্যাপারে পি.ভি. নরসিমা রাওয়ের পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অযোধ্যার প্রাচীন তুঘলকি স্থাপত্যশৈলী বাবরি মসজিদ বা বাবরের মসজিদ এখন শুধু ইতিহাসের অংশমাত্র। উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই মসজিদটি মোগল সম্রাট বাবরের আদেশে সেনাপতি মীর বাকি ১৫২৮-২৯ সালে নির্মাণ করেছিলেন। বাবরি মসজিদ জানপুরের সুলতানি স্থাপত্যের পরিচয় বহন করত। এই মসজিদ জানপুরের আতালা মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাহ্যত মোগলরা স্বতন্ত্র গঠনশৈলী সমৃদ্ধ তুঘলক রাজবংশের স্থাপত্যের প্রভাব বহন করেছিল। এক শ্রেণির হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাস, এ মসজিদের স্থানেই ছিল হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্রের জন্মস্থান। তবে আদৌ সেখানে কোনো রামমন্দির ছিল কিনা, সে সম্পর্কে ভিন্নমত রয়েছে। অবশ্য ২০০৩ সালে বাবরি মসজিদের নিচে একটি পুরোনো স্থাপনা ‘আবিস্কার’ করে ভারতের ভূমি জরিপ বিভাগ। তবে প্রমাণ করতে পারেনি- ওই স্থাপনাই ছিল রামমন্দির।

এই হৃদয়বিদারক বিষয়টি নিয়ে গত চারশ’ বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্র্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক চলছিল। অনেকে একে ‘অযোধ্যা বিতর্ক’ বলে অভিহিত করতেন। ১৯৪৯ সালে হিন্দু সক্রিয়তাবাদীরা হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জোট বেঁধে গোপনে রামের একটি মূর্তি মসজিদের ভেতরে রেখে দিলে নতুন বিতর্কের উদ্রেক হয়। এর পরই সরকার দাঙ্গা ঠেকানোর অজুহাতে পুরো মসজিদটি সিলগালা করে দেয়। উভয় সম্প্রদায়ই আদালতের দ্বারস্থ হয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বিজেপির করসেবক এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা মসজিদ আক্রমণ করে গুঁড়িয়ে দেয়। এই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষ মারা যায়, আহত হয় কয়েক হাজার। তাদের বেশিরভাগই ছিল মুসলমান। এতে দেশে-বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উদ্রেক হয়।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে হয়তো অনেকেই খুশি হবেন না। না হওয়ারই কথা। এই রায় নিয়ে সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন, ‘এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। চারশ’-পাঁচশ’ বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেওয়া হলো বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বললেন- ওখানে এবার মন্দির হবে। সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের ওপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হলো, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কাণ্ড আরও ঘটানো হবে না- সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?’

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন- বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার তীব্র দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি না ঘটলে সুপ্রিম কোর্ট এই রায় দিতে পারতেন না। তা ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি রিপোর্টকে আদালত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেই রিপোর্টের ঠিকমতো বিশ্নেষণ হয়নি। ওই রিপোর্টের বক্তব্য অনুযায়ী কোর্ট মেনে নিয়েছেন- মসজিদের নিচে কিছু একটা স্থাপনা ছিল। কিন্তু সেটা কি কোনো মন্দির বা মন্দির হলেও রামের মন্দির, না অন্য কিছু- তা প্রমাণিত হয়নি। কেউ আবার ৯ নভেম্বরকে ভারতীয় সংবিধানের জন্য একটি চরম ‘অমর্যাদার মুহূর্ত’ হিসেবে মন্তব্য করছেন। ভারতীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের বুঝতে হবে, কট্টর হিন্দুবাদী বিজেপি সরকার তাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নয়। কাশ্মীরে এক হাত নিয়ে সরকার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ভারতের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় এই রায়কে এখন কীভাবে নেবে, সেটাই হলো বড় প্রশ্ন। তবে বছরের পর বছর ধরে এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে যে পরিকল্পিত সংঘাত আর রক্তপাত হয়েছে; আপাতত এই রায়ে তার অবসান হবে বলে অনেকেই মনে করেন।

লেখক: হাসান শাহরিয়ার, সাংবাদিক, ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস, সিজেএ, জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি