শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

সরকারি চাল কেনা নিয়ে শুরু হয়েছে চালবাজি



2015_10_03_09_46_30_lPHxFqxxwZM8uOstia8y3NNgNs8o0a_original

সুনামগঞ্জে খাদ্য গোদামে সরবরাহের চাল আসছে বাইরে থেকে। অথচ সুনামগঞ্জের কৃষকেরা ধান বিক্রির জন্য ক্রেতা পাচ্ছেন না। মঙ্গলবার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ধান বিক্রয় হয়েছে ৬০০ টাকা, তাও ক্রেতার কাছে গিয়ে ধান কেনার জন্য অনুনয়-বিনয় করছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে, সরকারি খাদ্য গোদামে চাল দেবার জন্য চাল আনা হচ্ছে আশুগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ থেকে। অর্থাৎ সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে চাল কেনা নিয়ে শুরু হয়েছে চালবাজি।
এমন অনৈতিক কাজে খাদ্য গোদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যুক্ত রয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সোমবার রাতে এরকম অপরাধে সুনামগঞ্জ সদর থানায় এক ট্রাক চালককে আসামী করে মামলাও হয়েছে। মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (৩২) নামের ওই ট্রাক চালক সুনামগঞ্জের কয়ছর অটো রাইস মিলের ৯০০ বস্তা চাল নিয়ে রবিবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ খাদ্য গোদামের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। এই বিষয়ে দিরাই উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. কামরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ ট্রাকভর্তি এই চাল জব্দ করেন। পরে এই চাল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মুস্তফাকে সমঝে দেওয়া হয়। আর সাহাদাতকে সোপর্দ করা হয় পুলিশে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ জানান, ট্রাক ভর্তি চাল জব্দ করার পর সাহাদাত তাঁকে জানান, এই চাল আশুগঞ্জ থেকে তিনি সুনামগঞ্জের কয়ছর অটো রাইস মিলে নিয়ে এসেছেন। ওই মিলের মালিক রাসেল আহমদ তাকে অর্ধেক চাল তার মিলে এবং বাকি অর্ধেক সরকারি খাদ্য গুদামে দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু গুদামে চাল দেওয়ার আগেই জব্দ করা হয়।
নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ বলেন, সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের কারো যোগসাজশে এই চাল সরকারি গুদামে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। পরে সেগুলো জব্দ করে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করে চাল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে সমঝে দেওয়া হয়। আর ট্রাক চালক সাহাদাত হোসেনকে সোপর্দ করা হয় পুলিশে। স্থানীয় বাজার থেকে ধান না কিনে মিলের মালিকেরা বাইরে থেকে চাল কিনে এনে জেলার সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করছেন সন্দেহে এই ট্রাক ভর্তি চাল জব্দ করা হয়েছে।
রবিবার সন্ধ্যায় এই চাল জব্দ এবং ট্রাক চালককে আটক করা হলেও জেলা খাদ্য বিভাগ সোমবার রাত ১২ টায় থানায় মামলা করেছে। মামলার বাদী হয়েছেন সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা আব্দুর রউফ।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, শাহাদাতের বিরুদ্ধে ৪২০ ধারায় মামলা রুজু করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে ৭ দিনের রিমা-ে আনার জন্য আজ বুধবারই আদালতে আবেদন করা হবে।
কয়ছর অটো রাইস মিলের মালিক রাসেল আহমদের বাড়ি সুনামগঞ্জ শহরের হাজিপাড়া এলাকায়। তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের ছেলে। রাসেল আহমদ বলেন, ‘এই চাল তাদের। তাদের মিলের একটি যন্ত্র হঠাৎ বিকল হওয়ায় এই চাল পরিস্কার করার জন্য আশুগঞ্জের একটি মিলে পাঠানো হয়েছিল। এই চালের রসিদ আছে। কিন্তু চাল জব্দ করার পর তাদের সঙ্গে কেউ কোনো কথাই বলেননি। চাল আশুগঞ্জ থেকে কিনে আনা হয়নি।’
এদিকে, কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে মিল মালিকরা বাইরে থেকে ধান কিনে সরবরাহ করায় বাজারে ধানের দাম ক্রমশই নি¤œমুখী হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক মাখন লাল দাস বলেন, মঙ্গলবার স্থানীয় আড়ৎদারদের কাছে শুকনো চিকন চাল নিয়ে গিয়ে অনুনয় বিনয় করে ৬০০ টাকা মণে বিক্রি করেছেন। বিপদে না পড়লে কেউ ধান বিক্রি করছেন না। একই মন্তব্য করলেন এই উপজেলার নারায়ণপুরের অবিরাম দাস।
এই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘ধান-চাল কেনা শুরু হবার আগেই ধানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা’র কথা শুনে জেলা প্রশাসকসহ গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছি চালের বদলে ধান না কিনলে কৃষকের কোন উপকার হবে না। চাল মিলাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমনকি দেশের বাইরে থেকে আমদানী করা চাল খাদ্য গোদামে অধিক মুনাফার লোভে বিক্রি করবে। কোন কোন দুর্নীতিবাজ গোদাম কর্মকর্তাদেরও সহযোগিতা পাবে তারা। এখন এমনটাই দেখা যাচ্ছে।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, ‘সরকার সুনামগঞ্জ থেকে প্রায় ৩১ হাজার টন চাল কিনবে। স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে চাল ভাঙিয়ে এই চাল গোদামে সরবরাহ করলে স্থানীয় বাজারে ধানের দাম এক থেকে দেড়’শ টাকা বেড়ে যাবে। কৃষকদের সংকটও কমে যাবে। মিলাররা চাল নিয়ে এখন চালবাজি করলে আমরা কৃষকদের নিয়ে আন্দোলনে নামবো।’
ওদিকে রবিবার গভীর রাতে ধর্মপাশা উপজেলা সদরের হাসপাতাল রোডস্থ ত্রিমূখী মোড়ে পুলিশ একটি ট্রাক আটক করে। আটকের পর পুলিশ দেখতে পায় ত্রিপলের ভেতর খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত চালের বস্তা। প্রতিটি বস্তায় ৩০ কেজি করে চাল রয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা মঙ্গলবার বিকালে জানান, সুনামগঞ্জে চাল আটকের ঘটনা তদন্তের জন্য দিরাই উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন দিরাইয়ের খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুস সামাদ এবং দোয়ারাবাজারের উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. গোলাম কিবরিয়া।
তিনি জানান, জেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনে মিলাররা নিজের মিলে ভাঙিয়ে সরবরাহ করবেন। কোন অবস্থাতেই বাইরে থেকে চাল কিনে সরবরাহ করা যাবে না। এমন চেষ্টা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবার রাতে সুনামগঞ্জে চালের ট্রাক আটকের পর চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্ত কমিটি তদন্তের পর আরও কেউ যুক্ত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধর্মপাশার চাল আটক হয়েছে গোদামের অনেক দূরে। সেখানে বাদী হয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ২ জনকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে অন্যান্য ব্যবস্থা নেবেন উপজেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা তাকে সহযোগিতা করবেন।
প্রসঙ্গত. সরকার এবার প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা অর্থাৎ প্রতি মণ ধান ১০৪০ টাকা করে কিনবে। চাল আতব ৩৫ টাকা এবং সিদ্ধ কেনা হবে ৩৬ টাকা কেজিতে। সুনামগঞ্জ জেলায় ধান কেনা হবে ৬৫০৮ মে.টন এবং চাল আতব কেনা হবে ১৭ হাজার ৭৯৮ মে.টন এবং সিদ্ধ কেনা হবে ১৪ হাজার ১৭৯ মে.টন। সিদ্ধ চাল কেনা হবে তিনটি মিল থেকে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টন কেনা হবে সুনামগঞ্জের হক ও রাসেল অটো রাইস মিল থেকে।
সুনামগঞ্জে ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন।

….সুনামগঞ্জের খবর