সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার অধিকারী বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফ



সদ্য প্রয়াত বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

মোহাম্মদ সামিউল ইসলাম:

আমাদের রাজনীতিকে ঘিরে রয়েছে নানা কথা, কেউ রাজনীতিকে করেছে অপরিচ্ছন্ন আবার কেউবা একে করেছে মহিমান্বিত। আমাদের স্বাধীনতাত্তোর রাজনীতি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে। আর আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাঙ্গালি জাতি পেয়েছে এক স্বাধীন মানচিত্র। আর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। দেশ যখন সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে; ঠিক তখনই গতানুগতিক রাজনীতির ধারাকে বদলে দেয়া কোটি জনতার আস্থার প্রতীক, তারূণ্যের অনুপ্রেরণা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অদৃশ্য এক জগতে পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর এই বিদায় রাজনীতি নিয়ে স্বপ্নদেখা লক্ষ-কোটি তরুণ জনগোষ্ঠির হৃদয়কে ভেঙ্গে দিয়েছে। তিনি নিজেকে বিনির্মাণ করেছেন রাজনীতির হাতেখড়ি থেকে। একজন আশরাফ একটু একটু করে শত প্রতিকূলতার মাঝে নিজেকে হারাতে দেননি পার্থিব জগতের লোভ লালসা, পুঁজিবাদী দর্শণের কাছে। আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে খুবই কমসংখ্যক রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া যাবে যারা আপাদমস্তক শুধু মানুষের জন্য রাজনীতি করছেন।

সৈয়দ আশরাফ কেন অনন্য? উনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের মুজিব বাহিনীর একজন লড়াকু সৈনিক। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম একজন কান্ডারি। যার অনুভূতি ও অস্তিত্বে রয়েছে আওয়ামী লীগের দর্শণ। তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুই বারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেননি; গড়ে তুলেছেন আগামীর নেতৃত্ব। তাঁর মৃত্যুর খবরটি পাওয়ার পর রাজনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষের মত বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেজন্য কিশোরগঞ্জের শ্রদ্ধেয় দুই বড় ভাইকে মুঠোফোনে কথা বলে নিশ্চিত হলাম। বিষয়টি নিশ্চিত করা যতটা সহজ; তা মেনে নেয়া ততটাই কঠিন। এরূপ একটি দু:সংবাদ শোনার পর পরই বুকের ভিতরে চাপ অনুভব করি; ভেতরের কষ্ট সংবরণ করতে না পেরে অশ্রুসিক্ত নয়নে বহি:প্রকাশ হতে থাকে। এমনি একটি পরিস্থিতিতে ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের সামনে দীর্ঘরাত পর্যন্ত বসে আছি আমাদের নেতার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার জন্য এবং দেশবাসীর অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া শোনার জন্য। এতে করে আমি আরো বেশি নিজের আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। উনার রাজনৈতিক জীবনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে কখনই নিজের প্রয়োজনে উনার শরণাপন্ন হইনি। উনার রাজনীতির একটি দর্শণ হলো কখনই তদবির করা, অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা লাভ করা, কিংবা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য নিজের বলয় তৈরী করা –এর কোন কিছুকেই আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেননি। আর এই সমস্ত কারণেই তিনি শুধু কিশোরগঞ্জের সৈয়দ আশরাফ নন বরং গোটা জাতির নেতা হয়ে উঠেছেন। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা মনে পড়ছে; সৈয়দ আশরাফ ১৯৯৬ সালে কিশোরগঞ্জ সদর আসনে সর্বপ্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী একজন সংসদ সদস্য ছিলেন; যার শাসনামলে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে উনাদের ছাত্রসংগঠনের অস্ত্রের মহড়া ছিল নিয়মিত দৃশ্য। শহরের সকল ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির আতংকে দিনকাল অতিবাহিত করতো। সরকারী এমন কোন অফিস বা দপ্তর ছিল না যেখানে দলীয় প্রভাব খাটানো হয়নি। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ সাংসদ হওয়ার পর কিশোরগঞ্জবাসী রাজনীতির ঐসমস্ত অভিশপ্ত কর্মকান্ডের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে। তিনি টানা পাচঁবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া হয়নি তাঁর।

সৈয়দ আশরাফ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে যথেষ্ট পরিমিতিবোধ নিয়ে চলেছেন। আমি কিশোরগঞ্জের শিল্পকলা একাডেমিতে এক ইফতার পার্টিতে উপস্থিত ছিলাম। ঐ অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পরনে ছিল সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, মাথায় একটি সাদা রংঙের লস্বা টুপি। অত্যন্ত অল্প কথায় উনার বক্তব্য শেষ করেন। তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জবাসীর জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা উনার জেলার অনুরূপ শহর উন্নয়ন একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে সকলকে মালিকের ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্ততপক্ষে নিজ বাড়ির সামনের কাজটুকু তদারকি করবেন। আর আমি আপনাদের যা প্রয়োজন এর সার্বিক সহযোগীতা করব।’’ তার কিছুদিন পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এনিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাবেক মাকির্ন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের উদ্ধৃতি দিয়ে  বলেন-জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগের সাতদিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক লম্বা সময়। অর্থাৎ একজন রাজনীতিবিদ কতটুকু প্রজ্ঞা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতাসম্পন্ন হলে তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এমন ইঙ্গিত দেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহ অনেক বৈচিত্রে ভরপুর। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ঘরে জন্ম নেয়া সৈয়দ আশরাফ ছাত্র রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী, মুক্তি সংগ্রামে মুজিববাহিনীর অন্যতম লড়াকু সৈনিক ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে ১৫ ই আগস্ট জাতির জনকের হত্যাকান্ড ও ১৩ রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হলে সৈয়দ আশরাফ সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। দীর্ঘ দুই দশক প্রবাস জীবনে যুক্তরাজ্যে যুবলীগের প্রতিষ্ঠা সহ বাঙ্গালী কমিউনিটির ইউথ গ্রুপের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালে ফিরেনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা। দুই একটা ঘটনা প্রবাহ উল্লেখ করা যায়। ২০০৭ সালে ১/১১ পরবর্তী সরকারের সময় আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সৈয়দ আশরাফ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে দলের বেশ কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সংস্কারবাদী মনোভাব ও মাইনাস টু ফর্মুলার মতো ষড়যন্ত্রের মধ্যেও সৈয়দ আশরাফ ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবার ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতি নিবেদিত এক প্রান। ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামীর নেতৃত্বে কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠির লাগাতার অবস্থান যখন দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য হুমকিস্বরুপ ছিলো ঠিক সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে থেকে ওইসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন সৈয়দ আশরাফ।

বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের কাঁটা বিছানো রাজনীতির পিচ্ছিল পথে সৈয়দ আশরাফ কখনো পথহারা হননি বরং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বগুণের মাধ্যমেই মানুষের তরে কাজ করে গেছেন, তাঁর দলকে অধিষ্ঠিত করেছেন সুউচ্চ জায়গায়। তাঁর এই অসীম নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের পরপর দুই বার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই সাথে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বপালন করেছেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। কাজেই একজন আপাদমস্ত রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফ রাজনৈতিক জীবনে রাজনীতির ‘তাত্ত্বিক’ অর্থ প্রতিপালন করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতি যে কোন ভোগের বিষয় নয় বরং জনসেবার জন্য নিজের আত্মত্যাগ তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়ন প্রদানকালে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার সভায় বলেছিলেন, ’সৈয়দ আশরাফের নাকের ডগায় যতক্ষণ পর্যন্ত নি:শ্বাস আছে কিশোরগঞ্জ-৩ সংসদীয় আসনে এর কোন বিকল্প নেই’। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জন্য সৈয়দ আশরাফ কতটুকু অপরিহার্য। মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল রাজনীতির মধ্য দিয়ে সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশর কোটি মানুষের মনিকোঠায় ঠাই করে নিয়েছেন। সৈয়দ আশরাফের অনুপস্থিতি আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে একধরণের রক্তক্ষরণ অনুভব করবে। আর এই সমস্ত বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফের মত মানুষের জন্য রাজনীতি করার মানষিকতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদের শূন্যতা অনুভবন করবে। রাজনীতির রহস্যময় নেতা ও ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার অধিকারী বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফদের মৃত্যু হয় না, তাঁরা চীরকাল জীবিত থাকেন তাঁদের কর্মের মাধ্যমে। সৈয়দ আশরাফ হয়তো এখন আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তাঁর কর্ম ও  আদর্শ রয়ে গেছে। সৈয়দ আশরাফের আদর্শ বুকে ধারণ করে মানুষের জন্য রাজনীতি করার মানষিকতা নিয়ে সহশ্র সৈয়দ আশরাফ তৈরী হোক, গড়ে উঠুক সুন্দর রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

লেখক: মোহাম্মদ সামিউল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, শাবিপ্রবি।