সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

‘জাল টানে ওয়াহিদে, মাছ খায় নাহিদে’



 nahid_7419
 মোহাম্মদ শাকির হোসাইন:

বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে সিলেট-৬ আসন। এর মধ্যে বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের পুরনো ঘাঁটি। খোদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে দফায় দফায় এসেছেন সাংগঠনিক কাজে।

এখানকার দলীয় নেতাদের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। অথচ বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন ও ত্যাগীরা এখন সংগঠন থেকে অনেক দূরে। কেউ কেউ হয়েছেন বহিষ্কার।

ক্ষোভে, দুঃখে ও অপমানে কেউ কেউ দল ছেড়েছেন। আবার অনেকেই নিষ্ক্রিয় দলে চরম অবমূল্যায়ন, হয়রানি ও কোণঠাসা করে রাখার কারণে। ফলে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য বিয়ানীবাজার উপজেলায় আওয়ামী লীগ এখন তছনছ। জিম্মি গুটিকয়েক নেতার হাতে- যারা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অত্যন্ত আস্থাভাজন। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে যেন তারাই মন্ত্রী।

পাশাপাশি গোলাপগঞ্জের আওয়ামী লীগও তছনছ। কারণ শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন, অমুক-তমুক পরিচয়ে গুটিকয়েক ব্যক্তির দাপট, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অযাচিত আচরণ, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের নামে লুটপাট।

দলীয় সুত্র বলছে, কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নুরুল ইসলাম নাহিদ আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার পর থেকে কপাল পুড়তে শুরু করে দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের। ২০০১ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর সহচর ও বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এমএ আজিজকে (প্রয়াত)। অথচ আবদুল আজিজের বাড়িতেই রাত্রিযাপন করে সিলেট অঞ্চলে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

নাহিদ আওয়ামী লীগে যোগ দিলে দলে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুর আরেক ঘনিষ্ঠজন আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ শেখ ওয়াহিদুর রহমান। ক্ষোভে তখন তিনি গান লিখেছিলেন- ‘জাল টানে ওয়াহিদে, মাছ খায় নাহিদে’। তার সেই গান এখনও ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মুখে মুখে।

বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল মতিন। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি প্রতি ঈদুল আজহায় বঙ্গবন্ধুর নামে গরু কোরবানি দিতেন। এমনকি অসুস্থ হওয়ার পরও বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের হাল ধরে রেখেছিলেন। তার মালিকানাধীন নজিব ফার্মেসিই ছিল বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন কার্যালয়। বঙ্গবন্ধু বিয়ানীবাজার এলে ওই ফার্মেসির অফিসেই আড্ডা দিতেন।

সেই আবদুল মতিনের পরিবারের কেউই এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। সবাই বিএনপিতে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে আবদুল মতিনের ছেলে আবু নাসের পিন্টু বিএনপির প্রার্থী হয়ে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আবদুল মতিনের ভাতিজা আহমদ মহসিন বাবরকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দল থেকে বের করে দেয়া হয় সিলেট জেলা কৃষক লীগ সভাপতি আবদুর রাজ্জাককে। অথচ রাজ্জাক ছিলেন বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের অর্থের বড় জোগানদাতা। তার টাকায় সভা-সমাবেশ হতো বিয়ানীবাজারে। দলের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব মন্ত্রী নাহিদের আশীর্বাদপুষ্ট মহলের হাতে যাওয়ার পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন খলিলুর রহমানের মতো ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাও। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন।

তবে বহিষ্কার, নির্যাতন ও হয়রানির আতঙ্কে নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে কয়েকজন বঞ্চিত নেতা এসব কথা বলেছেন।

বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাসিব মনিয়া বলেন, পৌর নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার আশায় উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হইনি। অথচ পৌর নির্বাচনের সময় তিনজনের নাম ঢাকায় পাঠানোর কথা থাকলেও শুধু একজনের নাম পাঠানো হয় বলে শুনেছি। মূলকথা মনোনয়ন পেতে হলে মন্ত্রীর আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠজন হতে হয়। আমি হয়তো সেই পর্যায়ে নেই।

তিনি বলেন, যারা যারা মার্বেল দিয়ে বাড়ি করছেন, নতুন নতুন গাড়ি কিনছেন, তারাই এখন মন্ত্রীর আস্থাভাজন। তিনি বলেন, আব্বাস উদ্দিন যুবলীগের নেতা হল কীভাবে? আমি জানি না, তিনি যুবলীগ বা আওয়ামী লীগের কোন স্তরের নেতা!

তবে বিরোধীদের দাবি, মনিয়া মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে খাস জায়গা দখল করেছেন। মন্ত্রীর কাছ থেকে নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন। শিক্ষামন্ত্রী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রতি ইউনিয়ন কমিটির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর কথা থাকলেও যারা ফুল নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে মনিয়া খারাপ আচরণ করেন। সামনেই এমন ঘটনা ঘটলেও নীরব ছিলেন মন্ত্রী। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মনিয়া বলেন, ‘আমি খাস জমি দখল করিনি। আমার কেনা জমি শত্রু সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়েছিল। পরে বিধি মোতাবেক সংশোধন করেছি। অন্য অভিযোগগুলো সবই মিথ্যাচার।’

বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব অভিযোগ করেন, শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সংগঠনের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। মন্ত্রীর ডান হাত- বাম হাত পরিচয়দাতারাই দল চালায়। এই বিশেষ দলের সদস্য ১০-১৫ জন। পল্লব আরও বলেন, মূলত নাহিদ আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী। দলে আসার পর বিয়ানীবাজার আওয়ামী লীগের সাজানো-গোছানো সংসারকে ধ্বংস করে দিয়েছেন তিনি।

কমিউনিস্টের লোক ঢুকিয়ে মূল আওয়ামী লীগকে নষ্ট করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষামন্ত্রী মুজিব কোট পরতে বিব্রতবোধ করতেন। দ্বিতীয়বার মন্ত্রী হওয়ার পর দালাল ও চামচাদের ধমক খেয়ে মাঝেমধ্যে মুজিব কোট পরেন। আওয়ামী লীগে কমিউনিস্ট স্টাইল চলবে না।

পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবাদ আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে ছাত্রলীগকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করে রাখার। ‘মূলধারা’ নামের ছাত্রলীগের এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন তিনি।

ছাত্রলীগ কর্মী জাবিল হোসেন জানান, এবাদ আহমদ নিজেকে মন্ত্রী গ্রুপের নেতা পরিচয় দেন। অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঠিকাদারি করে ফল বিক্রেতা থেকে কোটিপতি হয়েছেন। এ ব্যাপারে বক্তব্য নেয়ার জন্য একাধিকবার মোবাইলে কল করা হলেও এবাদ (০১৮১৯৬৫০২৬০) ফোন রিসিভ করেননি।

যুবলীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুস টিটুর বিপক্ষে অভিযোগ, আমেরিকায় বসবাস করলেও বছরের বেশিরভাগ সময় দেশে থাকেন এবং মন্ত্রীর কাছের লোক পরিচয় দিয়ে নানা পন্থায় কোটি টাকা উপার্জন করছেন। যুবলীগ নেতাদের মন্ত্রীর কাছে যেতে দেন না তিনি। টিটু দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।

গোলাপগঞ্জে দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরও করুণ। কোন্দলের আগুনে পুড়ছে গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ। সদর থেকে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যন্ত নেতাকর্মীরা বহুধা বিভক্ত। প্রবীণ নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবাল আহমদ চৌধুরী, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সালেহ আহমদ চৌধুরী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জব্বার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ।

কিন্তু কেউ তাদের তেমন খোঁজখবর নিচ্ছেন না। একসময়ে উপজেলায় রাজনীতির ময়দান কাঁপানো এসব নেতা এখন অবহেলার শিকার হয়ে দলে কোণঠাসা। এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর আস্থাভাজন লোকজন। শুধু আওয়ামী লীগই নয়, যুবলীগ ছাত্রলীগেও একই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হতাশার শেষ নেই।

২০০৮ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পর আর কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেও শিক্ষামন্ত্রীর আস্থাভাজন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈয়দ মিছবাহ উদ্দিনের বাধার কারণে তা আটকে আছে। এতে পদবঞ্চিত হচ্ছেন দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা। দলের একটি সূত্র জানায়, সৈয়দ মিছবাহ উদ্দিনের নিজস্ব লোক নেই, তাই কোন্দলকে পুঁজি করে তিনি রাজনীতি করছেন। তিনি চান না দলের নতুন কমিটি গঠন হোক।

একই অবস্থা যুবলীগ ও ছাত্রলীগেও। এর মধ্যে একযুগ পার হয়েছে উপজেলা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির। যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ বিবাহিত, কেউ সন্তানের জনক। উপজেলা যুবলীগের মেয়াদ চলে গেছে ১৫ বছর আগে। নামেমাত্র আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে যুবলীগের কার্যক্রম।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈয়দ মিছবাহ উদ্দিন জানান, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা ও তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি সিলেট সফরকালে তিন প্রবীণ নেতা অ্যাডভোকেট ইকবাল আহমদ চৌধুরী, সালেহ আহমদ চৌধুরী ও আবদুল জব্বারকে দেখে গেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। নতুন কমিটির ব্যাপারে মিছবাহ বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের কাজ জেলা কমিটির। কমিটি না করার ব্যাপারে আমার কোনো হাত নেই।

নেতাকর্মীরা বলছেন, এ অবস্থার প্রভাবই পড়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। গোলাপগঞ্জে জেলা পরিষদের সদস্য বিএনপির। উপজেলা চেয়ারম্যান জামায়াতের। পৌর মেয়র হন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। ১১ ইউনিয়নের নির্বাচনে ৯টিতেই ভরাডুবি হয় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের। এমন ফল উপজেলায় আওয়ামী লীগের জনবিচ্ছিন্নতার চিত্র ফুটে ওঠেছে।