বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

বাচাঁর নতুন লড়াইয়ে নি:স্ব হাওরবাসি



pocha dhan

সিলেট24 রিপোর্ট:

২০ দিন আগেই কাচা ধান নিয়ে একের পর এক তলিয়েছে জেলার সবগুলো হাওর। হঠাৎ পানি এসে ফসল তলিয়ে গেলে হাওর খেয়ে ঢলের পানি স্থির হয়ে যায়। জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেইজলাবদ্ধ হাওরের কাচা ফসল পচে বিশেষ গ্যাস সৃষ্টি হয়ে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত করছে হাওরের মৎস্যসম্পদকে। হাওরের সাথে যুক্ত নদী ও হাওর-বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে সুস্বাদু দেশি মাছ মরে ভেসে ওঠছে।অক্সিজেন কমে যাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হাওরজুড়ে। ফসল ও মাছের পর একমাত্র সম্পদ ‘পানিও’ দূষিত হয়ে গেছে।

এমন চিত্র সুনামগঞ্জ জেলার হাওরগুলোতে। ধান হারিয়ে, মাছ হারিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন এই অঞ্চলের মানুষ। বেচে থাকার লড়াইয়ে বাড়ি ছেড়ে শহরমুখি হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষগুলো।

হাওড় ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, রাষ্ট্র ফসল রক্ষার জন্য টাকা বরাদ্ধ দিলেও যারা কাজ করেনি তাদের ব্যাপারে এখনো কোনো শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। যারা কৃষকদের নি:স্ব করেছে তাদের শাস্তি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্মপাশা উপজেলা সদরের কৃষক মামুনুর রহমান জানান, গত বছর আগাম বন্যায় তার ৯০ ভাগ ফসলহানী ঘটেছিল। এবার ফসলতো পাননিই উল্টো মাছের মরকে ভীষন উদ্বিগ্ন।

জয়শ্রী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মহসিন আহমদ  বলেন, ধান হারানোর পর এখন বেচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে মানুষ। এলাকায় জমি কেনার মতো কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না। কে কিনবে? কিভাবে কিনবে? প্রতিদিন রাজধানী সহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে কাজে সন্ধানে যাচ্ছেন তার এলাকার মানুষ।

শাল্লা উপজেলার সংবাদকর্মী পিসি দাস বলেন, আমাদের পুরো উপজেলা হাওর ঘেরা। চারদিকে মাছ মরে ভেসে ওঠছে। আমাদের প্রতিদিন হাওরের পানি ব্যবহার করতে হয় দৈনন্দিন কাজে। গত একসপ্তাহ ধরে আমরা সেই পানি ব্যবহার করতে পারছিনা। গন্ধেও বাড়িঘরে টেকা যাচ্ছেনা। মাছ ও পানি রক্ষা করতে এখনই উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, আমাদের এলাকার মানুষবাচ্চা-কাচ্চাকে হাওরের পানি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না। বড়রা ব্যবহার করলেও আক্রান্ত হচ্ছেন চর্মরোগে।

এদিকে, গত সোমবার থেকে ধর্মপাশা, জগন্নাথপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদরসহ বিভিন্ন এলাকার হাওরে চুন ছিটিয়ে দিচ্ছে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।

জেলা মৎস্য অফিসার শঙ্কর রঞ্জন দাস বলেন, হাওরগুলো জলাবদ্ধ। পানি ভর্তি থাকলেও বেরুতে পারছেনা। তাছাড়া কাচা ধান পচে নষ্ট হয়ে গ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে পানিতে অক্সিজেন ও পিএইসএর মাত্রা কমেছে। যে কারণে মাছ মরে যাচ্ছে এবং উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে। আমরা গন্ধ দূর করতে ও মাছ রক্ষা করতে সীমিত আকারে চুন ছিটানো শুরু করেছি। আমাদের লোকবল কম থাকায় সর্বত্রতাও করতে পারছিনা। তবে মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রকে আহ্বান জানিয়েছি মৎস্য রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল শুরু হলে এই সমস্যা কেটে যাবে বলে তিনি জানান।

সুজনের সংবাদ সম্মেলন:

সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। বুধবার দুপুরে শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদসম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজন জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট হোসেন তওফিক চৌধুরী। তিনি জানান, সুনামগঞ্জে এবার বোরো ফসল চাষ হয়েছে প্রায় সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে।সরকারি হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আবাদকৃত ফসলের ৮২ ভাগ বলা হলেও সেটা ৯০ ভাগের বেশি বলে মনে করেন কৃষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে বছরের একটিমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষকপরিবারগুলোতে হাহাকার চলছে।

Sunamganj pic-3 (1)

লিখিত বক্তব্যে তিনি পাউবো, ঠিকাদার ও পিআইসি’র অনিয়ম-দুর্নীতির নানা চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ফসলের সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ;মাধ্যমে সরকার ৬৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দদেয়। সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৭টি হাওরসহ ৪২টি হাওরে ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২২৫টি প্রকল্পের পিআইসি অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান-সদস্যদের সভাপতি করে গঠিত এসবপ্রকল্প অনুমোদন দেন স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ। অপরদিকে ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬টি প্যাকেজে ঠিকাদার দিয়ে বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে দরপত্র আহ্বান করে পাউবো। প্রকল্পের কাজ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারদের কাজ ৩১ মার্চ ২০১৭-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বরাদ্দকৃত অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করার অসৎ উদ্দেশ্যে অনেক পিআইসি ও ঠিকাদারগণ কাজ শুরু করেছেনকার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ সম্পন্নের শেষ পর্যায়ে এবং বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পরে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের সরকারি বরাদ্দের এই টাকাদিয়ে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও কাজ হয়েছে নামে মাত্র। বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ পাউবো প্রকৌশলী, পিআইসি, ঠিকাদারগণ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। ঠিকাদারের ২০টিবাঁধে কোনো কাজই হয়নি।

পাউবো-এর দাবি, কাজ না হওয়া বাঁধের সংখ্যা ১২টি। যার ফলশ্রুতিতে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসকল বাঁধের কাজ শুরু হয়নি ঐসকল বাঁধ এবং আংশিক নির্মিত একের পরএক ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়ে যেতে শুরু করে।

জানা যায়, ৩১ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ১১৬টি প্যাকেজের কাজে ঠিকাদারগণ সর্বোচ্চ ২০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করেন। বেশিরভাগ ঠিকাদার সম্পন্ন হওয়া কাজ থেকে বিল তুলে নেনঅনেক বেশি।

বাঁধ নির্মাণের এই দুর্নীতির সঙ্গে পাউবো’র যে তিন কর্মকর্তার নাম ওঠে এসেছে তারা হলেন সিলেটের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল হাই, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম সরকার ওসুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিন। অভিযোগের পর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। যদিও তার এই প্রত্যাহারকে গুরু পাপেলঘুদন্ড অথবা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে আড়াল করার অপপ্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে,বৃহস্পতবার সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম বলেছেন,  যাদের কারণে হাওরে ক্ষতি, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে একজনকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, হাওরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের কারণেই এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যারা এই অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে সাথে জড়িত তারা সংখ্যায় খুব কম। তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীর খাদ্যের কোন অভাব হবে না। যতোদিন নতুন ধান না ফলছে, অবস্থা স্বাভাবিক না হচ্ছে, ততোদিন সরকারের পক্ষ থেকে হাওরবাসীকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে।

বিএনপির সমালোচনা করে মায়া বলেন, তারা ঢাকায় বসে বিভিন্ন ফতোয়া দিচ্ছে। কিন্তু কেউ এখানে এসে হাওরবাসীর পাশে দাঁড়াতে দেখলাম না।

জামায়াত ছাড়া সকল রাজনৈতিক দলকে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীর সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

সভায় উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল, সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।