সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

শেষ হলো সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা



ben-10

প্রেস রিলিজ:
এত এত দর্শক, এত এত শ্রোতা। সবমিলিয়ে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম। অথচ নেই কোনো উৎশৃঙ্খলতা। সবাই যার যার মতো করে উপভোগ করলেন বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের শেষ দিনটি। সিলেটে এ ধরনের সাংস্কৃতিকবান্ধব পরিবেশ দেখে আয়োজকেরাও ভূয়সী প্রশংসা করলেন। সব ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত উৎসবের শেষ দিনে তাই দর্শক-শ্রোতারাই পরিণত হলেন আসল নায়কে।

শুক্রবার বেলা ১১টায় নগরের আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে আয়োজিত ১০ দিন ব্যাপী উৎসবের সমাপণী দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতেই ছিল ‘সিলেট হয়ে উঠুক আরো সিলেট’ শীর্ষক বিশেষ উপস্থাপনা ও আলোচনা সভা। সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ভবিষ্যতের সিলেট কেমন হবে, সে ধরনের গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত প্রদর্শন করা হয়। বেঙ্গল ইন্সটিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটলমেন্টসের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভার প্রথমেই আয়োজক প্রতিষ্ঠানে মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট স্থপতি কাজী খালিদ আশরাফ বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্য দেন প্রখ্যাত জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাইফ উল হক ও জেরিনা হোসেন।

_DSC8808

এ সেমিনারে আগামীর সিলেট কীভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে, সে সম্পর্কিত বিষয়াদি আলোচিত হয়েছে। বেলা চারটায় এ মঞ্চেই ‘ঘাসফুল’ চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় এখানে সুবচন নাট্যসংসদ মঞ্চনাটক ‘মহাজনের নাও’ পরিবেশন করে। বাউলস¤্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক এ নাটকটি দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

হাসন রাজা মঞ্চে বেলা চারটায় গীতিবিতান বাংলাদেশের শিল্পীরা দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয়। এ সংগঠনের পরিবেশনার পর শিল্পী অনিন্দিতা চৌধুরী গান পরিবেশন করেন। তিনি বেশ কয়েকটি নজরুলসংগীতের পাশাপাশি একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত লোকসংগীত শিল্পী রামকানাই দাশ রচিত ও সুরাপিত গান গেয়ে শোনান।

সন্ধ্যা পৌণে সাতটায় সমাপণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।

সমাপণী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার নাজমুন আরা খানম, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ও গোল্ডেন হার্ডেস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব সামদানী।

স্বাগত বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। আলোচনার ফাঁকে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরকে সিলেটের কয়েকটি সংগঠন সম্মাননা-ক্রেস্ট প্রদান করে। অতিথিরা বক্তব্যে এ ধরনের উৎসব ভবিষ্যতেও সিলেটে আয়োজন করার অনুরোধ জানান।

মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সিলেটের একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এর বাইরে এ অঞ্চলে রয়েছে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়েরও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। ষাটের দশকে বিভিন্ন গণআন্দোলনের সময় এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটের মরমি কবিরা যে আলোকিত পথ দেখিয়েছেন, সেটা খুবই সমৃদ্ধ। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি মানে বাঁচা, চরমভাবে বাঁচা।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের তাঁর বক্তৃতায় বারবার সিলেটবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সিলেটবাসী আমাদের যে আদর দেখিয়েছেন, ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ ও অভিভূত। প্রতিটি দিন সিলেটবাসী আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখানকার ৬০ শতাংশ জায়গা সবুজ ও পানিময়। এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন। অসাধারণ ও সমৃদ্ধময় এখানকার সংস্কৃতি। উৎসব আয়োজনে সিলেটবাসীর সহযোগিতায় আমরা সত্যিই মুগ্ধ। আমি প্রকৃতপক্ষেই সিলেটের প্রেমে পড়েছি।’

bonna

সমাপণী অধিবেশনের পর বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিল্পীরা দলীয় যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করেন। এরপর গান গাইতে মঞ্চে আসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তাঁর সুরেলা কণ্ঠের গানে মাঠজুড়ে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। সবশেষে লোকসংগীত পরিবেশন করেন বাউলশিল্পী শফি ম-ল। তাঁর পরিবেশনা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা নেচে-গেয়ে উপভোগ করেন।

উল্লেখ্য, ২২ ফেব্রুয়ারি ১০ দিনব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধন হয়। পুরো উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছিল জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাককে। ইনডেক্স গ্রুপ নিবেদিত এ উৎসবের সহযোগিতায় রয়েছে ঢাকা ব্যাংক। উৎসবের সম্প্রচার সহযোগী চ্যানেল আই। সৈয়দ মুজতবা আলী এবং হাসন রাজা মঞ্চে প্রতিদিন অনুষ্ঠান হওয়ার পাশাপাশি শাহ আবদুল করিম চত্বরে বাদ্যযন্ত্র ও সিলেট অঞ্চলের লোকগানের ইতিহাস নিয়ে প্রদর্শনী; গুরুসদয় দত্ত চত্বরে কারুমেলা ও বেঙ্গল প্যাভিলিয়ন এবং কুশিয়ারা কলোনেডে স্থাপত্য প্রদর্শনী হয়েছে। রাধারমণ দত্ত বেদিতে অনুষ্ঠিত হয় সুবীর চৌধুরী আর্ট ক্যাম্প। এ ছাড়া উৎসব চলাকালে তিন দিনব্যাপী কালি ও কলম সাহিত্য সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়।