বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

প্রবাসীরা কষ্ট লুকিয়ে সবার মুখে হাসি দেখতে চায়



opuসাইদুল অপু, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে:

প্রবাসী হয়েছি আজ প্রায় আট বছর। যেদিন প্রথম প্রবাসে আসি সেদিন একে একে সবার কাছে থেকে বিদায় নিলাম। আমার দাদু আমাকে কিছুটা আড়ালে ডেকে নিয়ে হাতের মুঠোয় কিছু টাকা গুঁজে দিলেন। আমি বললাম, দাদু আমার তো টাকার দরকার নেই, আমি টাকা দিয়ে কী করব? তিনি বললেন, বিমানে চকলেট কিনে খাবে। কয়েক মাস পর দাদু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দাদুর খবর জানতে আমি দেশে আমার চাচি আম্মাকে ফোন দিলাম। তিনি কথা বলা অবস্থায় হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর আমি হ্যালো হ্যালো বলছি, কোনো সাড়া শব্দ নেই। অল্পক্ষণ পর চাচি আম্মা ফোনের ওপাশ থেকে জানালেন, দাদু আর নেই।
দিনটি ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০।
আমার মতো অন্যান্য যাত্রী নিয়ে বাংলাদেশ বিমান যখন উড়াল দেওয়ার জন্য রানওয়েতে গেল তখন বাংলাদেশে ভোর। আব্বাকে ফোন দিলাম। তিনি জানালেন, ফজরের নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে হাত তুলে আমার জন্য দোয়া করছেন। প্রবাসী মাত্রই বুঝবেন ওই সময়টা কেমন লাগে। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম আবার দেখা হবে, ভালো থেকো। এরপর একে একে কেটে গেল কয়েকটি বছর।
৩ মার্চ ২০১৩ সাল। চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুধু এপাশ-ওপাশ করছি। এত যন্ত্রণা কোনো দিন লাগেনি। ওইসময় দেশ থেকে ফোন এল বন্ধু সাজ্জাদের কাছ থেকে। জিজ্ঞেস করল কেমন আছি? বললাম ভালো নেই, অশান্তি লাগছে। সে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে সরাসরি বলে দিল অপু, মামা আর নেই। আমি খুব কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলাম কোন মামা? সে উত্তর দিল তোর আব্বা। হতবিহ্বল এই আমি তখন দিকশূন্য। এত বড় দুঃসংবাদ আমার জীবনকে পাল্টে দিল। আমার চিন্তা ভাবনার জগতে তোলপাড় শুরু হলো, উড়ন্ত আমি ধপাস করে যেন মাটিতে পড়ে গেলাম।
প্রবাসে একাকী আমি যখন সবকিছু সামলে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত তখন আরেকটি খারাপ সংবাদ ধেয়ে আসল আমার দিকে। আব্বার চলে যাওয়ার মাত্র এগারো দিনের মাথায় ১৪ মার্চ ২০১৩ আমার নানিও শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। অসুস্থ হওয়ার আগে যখন তার সঙ্গে কথা হয়েছিল তখন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, দেশে কবে আসব। তিনি আমাকে আরও বলেছিলেন, তোমার জন্য টুনি আনব। আমি রসিকতা করে বলেছিলাম, তুমি থাকতে আর টুনির দরকার কী? মনে কর তুমিই আমার টুনি। আমার কথা শুনে আমার নানি যিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, হাসতে হাসতে শেষ।

মান্নান চাচা (আব্বার চাচাতো ভাই), আমাকে ছেলের মতো স্নেহ করতেন। দেশ ত্যাগের দিন বিদায় জানাতে বিমানবন্দর পর্যন্ত এসেছিলেন। ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর সকাল। ঘর থেকে বের হলাম কাজের উদ্দেশে। পথিমধ্যেই দেশ থেকে বড় বোনের মাধ্যমে জানতে পারলাম চাচা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের খবরাখবর নিতে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম চাচার সঙ্গে। তাঁর মনের আনন্দ হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আমি টের পাচ্ছিলাম। কথার একপর্যায়ে বললেন, আমাকে মিস করছেন। বললাম চাচা, আমিও যে খুব মিস করছি।
আমার ছোট চাচা, সিলেটে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো আমার সঙ্গে কোলাকুলি করে নিলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়াও করলেন। তারপর সবকিছু ভালো মতোই চলছিল। কিন্তু কখন যে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন টেরই পেলেন না। একদিন ফোনে দুজন খুব কান্নাকাটি করলাম, তারপর বললাম শিগগিরই দেখা হবে চাচা। কিন্তু তিনি আর আমার জন্য অপেক্ষা করলেন না, মাস তিনেক আগে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আমাদের হেলাল চাচা (আব্বার চাচাতো ভাই) একেবারে অস্বাভাবিকভাবে বয়স ৫০ হওয়ার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন। ওনার ব্যক্তিত্ব আমার ভালো লাগত। অনেক বড় মনের অধিকারী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ওনার ভাগনে রিফাত লন্ডন থেকে আমাকে ইনবক্সে মেসেজ পাঠাল—অপু ভাই, তোমার মনে আছে মামা তোমাকে কতটা আদর করতেন? ওই দিন আম্মা আমাকে জানালেন তিনি নাকি আম্মাকে বলেছিলেন, অপু দেশে আসলে ওকে নিয়ে আমি অনেক জায়গায় বেড়াব।
আটটি বছর ধরে এভাবেই আমি একের পর এক প্রিয়জন হারালাম। শুধু আমার জীবনেই এমনটা ঘটেছে তা নয়। আমি নিশ্চিত প্রায় সব প্রবাসীর জীবনেই কখনো না কখনো এমন সময় এসেছে। মাঝে মাঝে মনে হতো সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে যাই। এ জীবন আর ভালো লাগে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে যেত আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা প্রবাসী এক বড় ভাইয়ের কিছু কথা। তিনি বলেছিলেন, অপু, প্রবাস এমন একটা জায়গা যেখানে আসা যায় তবে যাওয়া যায় না। হয়তো কোনো একদিন তুমি দেশে বেড়াতে যাবে, তখন প্রথম ১৫ দিন সবাই জিজ্ঞেস করবে কবে আসলে? আর তার পরের দিনগুলোতে সবার জিজ্ঞাসা থাকবে কবে যাবে? অর্থাৎ তোমাকে তারা মেহমান হিসেবেই গ্রহণ করবে। তা ছাড়া তুমি তো আর একা নও, তোমার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন আছেন। তাদের কথাও তো তোমাকে চিন্তা করতে হবে, তোমার ওপর অনেক দায়িত্ব।
‘দায়িত্ব’ এই একটি শব্দেই যেন আষ্টেপৃষ্ঠে আছে প্রতিটা প্রবাসীর জীবন। প্রবাসীদের আত্মাটা অনেক বড় থাকে। তারা নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রেখে সবার মুখে হাসি দেখতে চায়। আর প্রিয়জনের মুখের এই একটু হাসি দেখার জন্য কখন যে নিজেদের যৌবন-তারুণ্য হারিয়ে বসে তার খেয়ালই রাখে না।
সব পাখিই নীড়ে ফেরে। বেঁচে থাকলে হয়তো আমিও ফিরব। তখন পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর পাশাপাশি খুঁজে ফিরব সেই সব আত্মার স্মৃতিগুলো যাদের সঙ্গে বছর আট আগে নিজের অজান্তেই সারা জীবনের জন্য বলা হয়ে গেছে, আবার দেখা হবে। সৌজন্যে: প্রথমআলো