বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

মুক্তির প্রহর গুনছেন তিনি



ariful-haq-chowdhury

মো. শাকির হোসাইন:

২০ নভেম্বর ২০১৬।ঘড়ির কাটা দুপুর একটার ঘর ছুঁইছুঁই।কিছুক্ষণ আগে অর্থমন্ত্রী আলীয়া মাঠে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থলের কাজের অগ্রগতি দেখতে। পুলিশ, সাংবাদিক ও নেতাকর্মীদের ঢল সামলে মন্ত্রী চলে গেছেন নিজ বাড়িতে। মন্ত্রীর বহর থাকাকালীন সড়ক বন্ধ থাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

চৌহাট্রা ট্রাফিক সিগনালে একটি এ্যাম্বুলেন্স করুণ সুরে একজন অসুস্থ মানুষ বহনের কথা জানান দিচ্ছে সবাইকে। তবে কারো সেদিকে খেয়াল দেয়ার সময় নেই। কত এ্যাম্বুলেন্সই আসে এদিকে দিনে নাহলেও ৫০-৬০ বারতো হবেই। আর এ্যাম্বুলেন্স ইমারজেন্সি হুইসেল বাজালেই কি আর না বাজালেই কি? কেউ কি সেদিকে কখনো ভ্রুক্ষেপ করে? করে না। ট্রাফিকেরও কোন নিয়ম হয়তো নেই যে এ্যাম্বুলেন্স আসলেই সিগনাল তুলে ফেলবে। সেরকম নিয়ম থাকলে এ্যাম্বুলেন্স পাহাড়ায় থাকা পুলিশ হয়তো গিয়ে ট্রাফিককে মনে করিয়ে দিত এটা এ্যাম্বুলেন্স, সিগনাল তোল। সেরকমটি হয়নি। তাতে সাধারণের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে সিগনালে পড়লে সব সমান। তবে সরকার দলীয় নেতাকর্মীর কথা আলাদা। তারা সামান্য সুযোগ-সুবিধা যদি না নেয় তাহলে তাদের সম্মান থাকে কোথায়?

এ্যাম্বুলেন্সটার করুণ হুইসেল বেজেই চলেছে।চোখ পড়তেই দেখি একজন মানুষ এ্যাম্বুলেন্সের জানালা ধরে বসে আছেন। দৃষ্টিতে উদাসি ভাব। নির্বিকার চোখে নগরের মানুষগুলোর দিকে চেয়ে আছেন। মাঝে মাঝে হাত নাড়ছেন। মানুষের সালামের জবাব দিচ্ছেন ইশারায়। একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে গেলাম তার কাছে। কুশল জিজ্ঞেস করলাম। বললেন এইতো আছি জেল আর হাসপাতাল মিলিয়ে। এখন হাসপাতাল থেকে জেলে নেয়া হচ্ছে। চেকআপ করিয়ে আসলাম। পাশে আরেকটি মানুষের দিকে চোখ গেল। বড়ই অসহায় মনে হলো তাঁকে। হয়ত জনপ্রতিনিধিরা এরকমই আচরণ করেন সাধারনের সাথে। হয়তবা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, নয়তবা হতাশ।

এই মানুষটার সাথে আমার কেমন যেন খুঁনসুটি সম্পর্ক। একসময় এনটিভিতে থাকাকালীন ঘন ঘন আসতেন আমাদের অফিসে। বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। তখন তাকে কত কথাই না বলতাম। শুধু হাসতেন। জবাবও দিতেন পরিস্কার করে। কোন রাখঢাক ছাড়াই। টিপ্পনী কাটতাম। তিনি বিষয়টি উপভোগ করতেন। যদিও মেয়র আরিফুল হকের অনেক কর্মকান্ডের আমি ঘোর বিরোধী। আবার এটাও বিশ্বাস করি এই মানুষটা ৫ বছর সময় পেলে পাল্টে যেত নগরীর চিত্র।

তিনি আমার হাত ধরে আছেন। কি বলব, ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এই মুহুর্তে তিনি একজন বন্দি মানুষ।হয়ত কত আইন-কানুন আছে বন্দির সাথে কথা বলার। ট্রাফিক সিগনালে কথা বলা যায় কি না তা আমি জানিনা। কেন যেন এই মানুষটার প্রতি একটু আলাদা টান অনুভব করি। মনে হয় সুযোগ পেলে জনগনের জন্যে কিছু করার একটা ইচ্ছা হয়তো আছে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। অন্যরাও জনগনের জন্য করেন। তাদেরকেও আমি ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি।

হাত ধরা হাতে বললাম, আপনারতো জামিন হয়ে গেছে। তিনি বললেন,” কাগজপত্র এখনো আসেনি, দোয়া কইরো”। সঙ্গে পুলিশ থাকায় সেই পুলিশের বিরক্ত হওয়া দুটি চোখ আমার নজরে পড়ল। ভাল থাকেন, চিন্তা করবেননা বলে আশ্বস্থ করার চেষ্টা করে চলে এলাম। ততক্ষণে সিগনাল উঠলো।

আমার গন্তব্য অর্থমন্ত্রীর বাসায়। সেখানে আওয়ামীলীগের দুজন নেতার ইন্টারভিউ নেবার কাজ। দলের প্রিপারেশন বিষয়ে।

চৌহাট্রা থেকে জেলরোড পয়েন্ট পর্যন্ত এ্যাম্বুলেন্সটি অনুসরণ করতেই হলো। যে মানুষটা সড়কে দাড়িয়ে থাকা লোকদের দিকে হাত নাড়ছেন, তিনি এই নগরেরই নির্বাচিত নগরপিতা। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। বর্তমানে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরীয়া হত্যা মামলার আসামী হয়ে কারাবন্দি। সম্প্রতি আপীল বিভিাগ তাঁর জামিন বহাল রাখায় যেকোন সময় কারামুক্তি পাবেন এই বরখাস্তকৃত মেয়র। সেই প্রতীক্ষায় তাঁর চোখে মুখে হালকা আলোর ঝলকানী থাকাটাইতো স্বাভাবিক।

তবে নগরবাসীর শংকা নতুন কোনো মামলা দেয়া হবে না তো তাঁর বিরুদ্ধে? দেখানো হবেনাতো শ্যোন এরেস্ট?

তা না হলে হয়ত শিগগিরই মুক্তি মিলবে নগরপিতার।