বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে



ikbalইকবাল কাগজী
বসেছিলাম মধ্যবিত্তে। মধ্যবিত্ত আসলে সুনামগঞ্জ শহরের পৌর বিপণির নিচতলায় একটি কাপড়ের দোকান। বিপণি চত্তরের পশ্চিমে এই বস্ত্রবিপণিটি বেশ সাজানো গুছানো, একটু একটু সুন্দরী মতোন। আইডিয়াল লাইব্রেরির পাশেই দক্ষিণে। বস্ত্র বিপণি হিসেবে এটি একটু ব্যাতিক্রমীও বটে। কাপড়ের দোকানে সাহিত্য পাওয়া যায় না। অবাক না হয়ে পারা যায় না, এই দোকানটিতে কাপড়ের সঙ্গে কবিতাও বিক্রি হয়। কবিতার সঙ্গে রাধারমণ-হাসন-করিমের গান কিংবা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দের বই ও তাঁদের পটে আঁকা ছবি ইত্যাদি। এই ইত্যাদির মধ্যে আরও আছে আনকোরা কীছু বইসহ দু’একটি নামকরা মাসিক, ত্রৈমাসিক ও সাপ্তাহিক একতা। ড. সিরাজুল ইসলামের নতুন দিগন্তের সঙ্গে এখানে মিলে কলকাতার দেশ, সানন্দা,আনন্দেেমলা,বইয়ের দেশ। এর বেশি আর কী চাই মধ্যবিত্তের কাছ থেকে?
এনামুল কবীর ও শামস শামীমসহ নতুনদের মধ্যে কেউ কেউ আমরা বিশেষ প্রয়োজনে কোনও বই ফরমায়েস করে আনিয়ে নিতে পারি মধ্যবিত্ত থেকে। এই দলে পড়েন প্রবীণ আইনজীবী স্বপন কুমার দেবও। আসলে বইয়ের গন্ধ নিতেই এখানে এসে মাঝে মাঝে বসি। কেনাবেচার ফাঁক-ফোঁকড়ে একটু-আধটু আড্ডাও যে হয়ে যায় না মধ্যবিত্তাধিকারী মানবেন্দ্র করের সঙ্গে এমন নয়। তাছাড়া এখানে মাঝে মধ্যে দেখা হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে। তিনি ইদানিং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উৎঘাটনে ভীষণ ব্যস্ত আছেন, সঙ্গে তাল মিলিয়ে আছেন মুক্তিযেপাদ্ধা মালেক হুসেন পীর, আর এক বন্ধু আমার। কিংবা সহসাই কবি কুমার সৌরভের সুরভিত সঙ্গ এখানে পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। এইসব সাক্ষাতের সময়টা তখন আরও বেশি বর্ণাঢ্য হয়ে যায়, বসন্ত সমীরণে প্রফুল্ল প্রকৃতির মতোন তখন সহাস্য সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে জীবনের পরতে পরতে।
বস্ত্রভা-ারের নাম মধ্যবিত্ত। শব্দটিতে অর্থনীতির গন্ধ মাখোমাখো করা। সে নাকি গরিবও নয় ধনীও নয়। নামটা একটু ব্যতিক্রমী সৌরভে সুশোভিতই, মানতেই হবে। বাংলাদেশে দোকান কিংবা অন্য কীছু প্রতিষ্ঠানের নাম, এমনকি মানুষের নামও এমন বিশুদ্ধ বাংলায় সাধারণত হয় না। হলেও কালেভদ্রে। ব্যতিক্রম ব্যতীত ইংরেজি ছাড়া বাংলাদেশের মানুষেরা অন্তত দোকান কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতেই পারেন না। সুনামগঞ্জ শহরের অলিগলিতে যেসব দোকান প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর নামফলকে নজর দিলে ইংরেজি শব্দের সগর্ব আধিক্যযুক্ত উপস্থিতির জৌলুসে নয়নমন সার্থক হবে। এর অন্যথা কীছুতেই হবে না। এ শহরে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভা-ারের মতো বিশুদ্ধ বাংলায় খুব কম দোকানের নামই পাওয়া যাবে। আলফাত চত্বরেই আছে দাস ব্রাদার্স, এটিতে ইংরেজি এসে বাংলা দাসের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে অনায়াসে, বাংলা বধুর পাশে ইংল্যান্ডের বর, রোমাঞ্চকর হৃদয়ঘটিত ব্যাপার-স্যাপারের মতোন। দাস ব্রাদার্সের পাশেই লাগা দক্ষিণে সিটি ফার্মেসির পুরোটাই রাহুগ্রস্ত চন্দ্রের মতো ইংরেজির উদরস্থ। অর্থাৎ ১৭৫৭ সনে ২৩ জুনের ইংরেজদের রাজ্যবিস্তার প্রসারিত হতে হতে বাঙালির মনের জগতটাকে অধিকার করে নিয়েছে। আলফাত চত্বর নামটির ‘চত্বর’ প্রথমে আসে স্কয়ার হয়ে, পরে ইংরেজি স্কয়ারের বাংলা করে আমরা আসি বাংলা চত্বরে। আমাদের মনের জগতে ইংরেজির ঔপনিবেশিক বিস্তার এতটাই যে, ‘পৌরবিপণি’ বলার পর ‘মার্কেট’ না লাগালে আমাদের মন ভরে না। আমরা বলি ‘পৌরবিপণি মার্কেট’। যা মোটেও ভাষাবিধিসম্মত নয়। এমনকি পৌরকর্তৃপক্ষ পর্যন্ত ‘পৌরবিপণি মার্কেটে’ ভীষণ অভ্যস্ত। বাঙালির চিন্তার জগতে ইংরেজির এইরূপ ঔপনিবেশিকতার বিস্তার অব্যাহত আছে, ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ভারত ছাড়ার বলতে গেলে প্রায় ৭০ বছর পরেও। ইংরেজরা সশরীরে এখানে অনুপস্থিত বটে, কিন্তু তাদের ভাষা সৈনিকের রাজ্যবিস্তার এক মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই, বিপুল বিক্রমে চলছেই। শঙ্খঘোষ কলকাতার ভাষা বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বলতে গিয়ে সে হারিয়ে ফেলেছে খেই/ বাংলায় এক কলকাতা আছে বটে/ সে কলকাতায় বাংলা কোথাও নেই।’ সুনামগঞ্জেও অনেকটা সে-রকমই, বাংলা-সংস্কৃতি বিচ্ছিন্নতার নিদর্শন এখানে যে একেবারেই নেই সেটা হলফ করে কেউ বলতে পারবেন না। দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।
দুপুর তখন একটা বেজে ত্রিশ। বিদ্যালয়গুলোতে চলছে নিয়ম মাফিক এক ঘন্টার পাঠবিরতি। পাঠগ্রহণের ফাঁকে এক চিলতে অবকাশ। ফকফকে সাদা জামা আর চকচকে নীল প্যান্ট পরে ওরা জুবিলির ১৩ জন এলো পৌরবিপণির মধ্যবিত্তে। তখন মনে হলো একটা কবিতা লিখি, লিখি, ‘কতিপয় শুভ্রনীল পারাবত নেমে এলে পৌরবিপণির রৌদ্রিল চত্বরে।’ গরজ  তাদের গেঞ্জি কেনার।
সে কেমন গেঞ্জি? গেঞ্জি হবে গেঞ্জির মতোই, তবে তার বুকে ফ্যাশনের পাঁচফোড়নের পোঁচ থাকা চাইই চাই। আমাদের ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ফ্যাশনের ঠিকঠাক বাংলা দিতে পারেননি। মনে হয় ইচ্ছে করেই দেননি। অকারণে অপারক তিনি প্রশ্ন করেছেন, “ফ্যাশনের ঠিকঠাক বাংলা কি? ‘চল’ নাকি ‘চালিয়াতি’?” তারপর বলেছেন, ‘যাই হোক না কেন, ফ্যাশন ডিজাইনটা যে জীবনের ব্যাপর নয়, এমনকি জীবিকারও ব্যাপার নয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সত্য তো প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না।’
ফ্যাশনের পাঁচফোড়নের পোঁচ দিয়ে রাঙিয়ে দিতে হবে গেঞ্জির বুকটা। মানবেন্দ্র করকে সেখানে কসরত করতে হবে স্কিনপ্রিন্টিংয়ের কারিকুরির কঠিন কাজে, কে জানে কতক্ষণ। দৃষ্টিনন্দন করে দিতে হবে ASTEROIDS শব্দটিকে বর্ণের রেখায়। ফ্যাশনের যেমন তেমনি ASTEROIDS শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই। ফ্যাশন শব্দটা শুনলেই মনে একটা সংজ্ঞার্থ কী করে জানি না ছবি হয়ে ফুটে। কিন্তু ASTEROIDS শব্দটা তেমন কোনও সংজ্ঞার্থের প্রতিচ্ছবি মনের পটে আঁকতে পারে না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বলেছেন, ‘ফ্যাশনটা প্রয়োজনের কিংবা বাধ্যবাধকতার নয়, ব্যাপার  সৌখিনতার, বিলাসের, আদরের-আহ্লাদের। এবং ব্যাপার শ্রেণীরও। ফ্যাশন বিত্তবানরাই করে।’ ফ্যাশন শব্দটাও উচ্চারিত হলে এই সংজ্ঞার্থটি মনের মধ্যে সর্বাগ্রে জেগে উঠে।
ASTEROIDS শব্দটিকে নির্বাচনের রহস্য কী? এর একটাই সদোত্তর হতে পারে। আর সেটা হলো, স্বাজাত্যবোধের কিংবা স্বাজাত্যাভিমানের অভাব, আর এই অভাবের পঙ্কিলতার মধ্যে উৎপন্ন হওয়া বিচ্ছিন্নতার ব্যাধি। ১৯১৩-তে গীতাঞ্জলির ইংরেজি ভাষান্তর নোবেল পেয়েছিল, মূল বাংলা পাত্তা পায়নি। পূর্ব পশ্চিমের ঘরে গেল ইংরেজির হাত ধরে। তার ছয় দশক পর ইংরেজির হাত ধরে নয়, বাংলার হাতে হাত রেখেই পূর্ব গেল পশ্চিমের কাছে। জাতিসংঘের সভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন বাংলায়। বিশ্ববাসীকে পাত্তা দিতেই হলো বাংলাকে, অবহেলা করা সম্ভব হলো না। বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে ভাষণ দিতেই পারতেন। কিন্তু বাংলায় দিয়েছিলেন এজন্য যে, তিনি বিশ্ববাসীকে বলতে চেয়েছেন, ‘আমি বাঙালি। পৃথিবীতে ইংরেজি, ফরাসী, আরবি, মান্দারিন ইত্যাদি ভাষার মতোই বাংলা একটা ভাষা। তোমরা যেমন ইংরেজি, আরবিতে কথা বলো তেমনি আমি কথা বলি বাংলায়। আমি বাংলায় বলবো, তোমার তোমাদের সুবিধামতো অনুবাদে আমার কথা শুনবে। তোমরা বলবে তোমাদের ভাষায়, আমি শুনবো আমার ভাষায়।’ বঙ্গবন্ধুর স্বাজাত্যবোধ ছিল এমনি উঁচু তারে বাঁধা। এর সুরে ছিল হাজার বছরের জাতিগত ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক সমুন্নতি, যাকে বলা যায় বাঙালি জাতিসত্ত্বার পূর্ণ রূপায়ণ। বাঙালির এই আত্ম-অহংকার থেকে যে যতটা বিচ্যুত সে ততটা বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে আক্রান্ত, সে ততোটাই সুস্থ নয়। কেবল এই বোধই বঙ্গবন্ধুকে এক প্রকার ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা থেকে রক্ষা করে তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিতে পরিণত করেছিল এবং এইভাবে রবীন্দ্রনাথের পংক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিলেন একজন রাজনীতির কবি কিংবা কবি রাজনীতিক। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকল্প আঁকতে গিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি উঁচু তাঁর সৌম্য দেহখানি/ আমাদের আকাশপ্রদীপ স্বপ্ন, স্বাধীনতা।’
বাংলাদেশ এখনও স্বাজাত্যবোধ থেকে কিংবা বলা ভাল বঙ্গবন্ধুর জীবনজুড়া বাঙালিত্বের গৌরব থেকে, সাংস্কৃতিকভাবে কতটা পশ্চাৎপদ তার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো এই তোরো জন উজ্জ্বল কিশোরের ASTEROIDS শব্দটির প্রতি অকারণ অনুরাগ। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষারই অনুবাদ অযোগ্য শব্দ থাকে। ভাষান্তর করা যায় না বলে সে শব্দটাই ব্যবহার করতে হয়। আমরা বাংলাভাষীরা কেবল নয় বিশ্বজুড়া অন্য যে কোন ভাষার লোকেরাই তা করে থাকেন। এমনকি ইংরেজরাও। তারাও বাংলা অবতার ও জগন্নাথকে আবাটার ও জগুরন্যাট করে নিয়েছে। এদুটোর ইংরেজি প্রতিশব্দ তারা পায়নি। ASTEROIDS শব্দটির গ্রহণযোগ্য সর্বোত্তম বাংলা শব্দ আছে গ্রহাণুপুঞ্জ। তো আমরা কেন ইংরেজী  ASTEROIDS এর মুখাপেক্ষী হবো? ৭১-য়ে স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেছে। কিশোরদের পছন্দকে ASTEROIDS এর অন্ধকার থেকে গ্রহাণুপুঞ্জের বিকিরিত সৌন্দর্যের দিকে আমরা ফেরাতে পারিনি। তারা ASTEROIDS এর ঔপনিবেশিক সৌন্দর্যের জগতে এখনও অভিবাসী। ইংরেজরা তাদের পৌনে দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনসময়ে বাঙালির জন্য স্বজাতি, স্বভাষা কিংবা স্বসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার যে অন্ধকার পথ তৈরি করেছিল, সে পথ থেকে এই কিশোরদেরকে আমরা ফিরিয়ে রাখতে পারিনি। অথচ এই কদিন আগে এই সোনার ছেলেরাই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের স্থানান্তর প্রক্রিয়া রুখে দিয়েছে আন্দোলন করে। জানিয়ে দিয়েছে, শহিদ মিনার নিয়ে যাচ্ছেতাই করা যাবে না। কিন্তু উপরে আলোচ্য এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির সংগ্রাম তো আমরা শুরু করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে সেই ৭১-য়ে, যেদিন পাকিস্তানি দখলদারদের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিলাম, তাদেরকে মাতৃভূমির মাটি থেকে তাড়ানোর জন্য। এই সংগ্রাম নিরবচ্ছিন্ন হতে পারতো, যদি না মাঝপথে ১৯৭৫-য়ে ১৫ আগস্টের কলঙ্কজনক হত্যাকা-টির পর আবার ঔপনিবেশিকতার কারিন্দারা (দালাল রাজাকার) রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে না আসতো। আমাদের নতুন প্রজন্মকে ঔপনিবেশিকতার বিচ্ছিন্নতা থেকে ফেরাতে পারিনি যে তার আরও প্রমাণ আছে। ছাত্রদের ছাত্রত্ব নিরবচ্ছিন্ন নবিশীত্বর মধ্যে প্রকটিত হয়। আমরা তাদের পূর্বসূরিরা তাদেরকে শেখাবো, প্রকৃত নবিশ করে তোলবো। আমরা তাদের অভিভাবক। কিন্তু আমরাই যদি ভুল পথে পথ মাপি আমাদের যাপিত জীবনে, তখন তারা তো তা অনুসরণ করবেই। দোষটা নবিশ উত্তরসূরির নয় পূর্বসূরিরই।
এনামুল কবীর সুনামগঞ্জে শহরে এলেই, সন্ধ্যার আঁধারে ‘রিভার ভিউ’ গিয়ে বসতে বড় বেশি ভালোবাসেন। এই বিনোদনটুকুর সময় তাঁর সঙ্গে থাকে তারেকসহ অন্য কেউ কেউ। কালেভদ্রে আমিও সঙ্গী হই না যে এমন নয়। তখন ‘রিভার ভিউ’ শব্দটা শুনলে ও দেখলেই কেন জানি না একটা প্রতিক্রিয়া আমার মধ্যে তলে তলে মুখিয়ে উঠে। কিন্তু হাসপাতাল, ইস্কুল, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদির বেলায় এমনটা হয় না। কারণটা এই যে, বাংলাভাষাদেশে বিদেশি শব্দের এইরূপ অবাধ অনুপ্রবেশ করার সুযোগটাকে বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষের লোক আমি। ব্যতিক্রম ব্যতীত ইংরেজরা বিন্তু এই রকম ক্ষেত্রে ভাষার দুয়ারটাকে একেবারেই বন্ধ করে রেখে দেয়, তাদের ভাষায় কোনও বিদেশি শব্দ বা বাংলা শব্দ একেবারেই প্রবেশ করতে পারে না। অথচ আমরা অবাধে ইংরেজিকে বাংলায় প্রবেশ করতে দিচ্ছি, যেভাবে ১৭৫৭-র পর উপনিবেশ বিস্তার করতে দিয়েছিলাম। এ ক্ষেত্রে ইংরেজের স্বাজাত্যবোধ এতই তীক্ষè, প্রগাঢ় ও গভীর যে তারা ভাষা বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হতে চায় না কীছুতেই। তারা বলে, “দেখুন, শুচিতার প্রশ্ন নয়, বাস্তব সমস্যাও প্রচুর। … ভারতীয়রা বলছেন ‘Load sheding, মালয়েশীয়রা বলছেন browm out’ এই রকম একই বিষয়কে ইংরেজি শব্দেই বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আমরা যদি সব শব্দকে ঠাঁই দিতে যাই তা হলে আমাদের নিজেদের শব্দ সংসারটার নাভিশ্বাস উঠবে। তাছাড়া আপনারা যেটাকে আমাদের স্বভাবধর্মী বলছেন তা নাও হতে পারে।” কিন্তু কী অবাক! দেদার ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটলেও আমাদের দেশের লোকদের মধ্যে বিশেষ এক শ্রেণি, স্তর বা অংশের প্রতিনিধিরা কোনও বিকারবোধ তো করেনই না, বরং স্বস্তিবোধ করেন। ভাষাবিচ্ছিন্নতার শুককীট গ্রহণে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হন না।
উকিলপাড়ার চৌরাস্তা থেকে জুবিলি বালুর মাঠের পূর্বপাশের নদীর দিকে যাওয়া রাস্তার মুখে বানানো সুদৃশ্য বহিঃদ্বার বা তোরণের চাদিতে লিখে রাখা ‘রিভার ভিউ’-কে আমি মনে মনে ‘নদী নিসর্গ’ কওে দেই, যেদিন যাই সেদিনই। এখানে এলেই আমি জাতিগত হীনমন্যতার গন্ধ পাই, এই ‘রিভার ভিউ’ শব্দটির মধ্যে। মনে হয় বাংলা মাকে আমি ভিখারি করে দিয়েছি। বাংলা ভাষাকে ভাব প্রকাশে অক্ষম করে দিয়েছি। নিজেকে কেবল প্রশ্ন করি, আমার নদীকে আমি কেন ‘রিভার’ বলবো, দৃশ্যকে বলবো ‘ভিউ’? এমন বলার পক্ষে কী যুক্তি আছে? তা হলে আমি কি আমার মাতৃভাষা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছি? ইদী বলতে আমাদের লজ্জা কেন? নদী বলতে বাধা কোথায় কিংবা কীসে? যে ভাষায় ১৯১৩ সালে নোবেল এসেছে। রোকেয়া, মধুসূধন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের পরে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছেন, এসে গেছেন নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ, কমলকুমার, শামসুর রাহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সমরেশ বসু, সুবোধ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, শহীদুল জহির। তারপর আত্মগর্বী হতে আমার আর কী চাই? ইংরেজরা কতজন মহাশ্বেতা দেবী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, দেবেশ রায়, হাসান আজিজুল হক দেখাতে পারবে? ওরা তো বাংলা ভারতের সম্পদ লুটে নিয়েই বড় হয়েছে, হয়েছে সা¤্রাজ্যবাদী। তাদের ভাষা হয়েছে সা¤্রাজ্যবাদী ভাষা। আমি কেন সে সাম্যাজ্যবাদী ভাষার কারিন্দা বা দালাল হতে যাবো?  পরদেশের পরজাতির দালাল না হওয়ার সচেতনতা আমার থাকবে না কেন? আমরা আর কতকাল এবং কেন মেকলে সৃষ্ট কারিন্দা হয়ে থাকবো, যারা রক্তমাংসে হবে বাংলা-ভারতীয় কিন্তু মনে-মননে হবে ইংরেজ? না কি আমরা অতীতে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার আত্মবিলীন সময়ের জটিলতায় এখনও আটকে আছি, মুক্তি ঘটেনি আমাদের? আসলে এটি ইংরেজির অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য নয়, আমাদের নিজেদের মানসিক বশ্যতা, আমাদের নিজের ভেতরে সুপ্ত হীনমন্যতার বহি:প্রকাশ। ১৯৬৩ সালে একজন আফ্রিকান লেখক, নাম ওবি ওয়ালি, তিনি লিখেছেন, “শিক্ষিত আফ্রিকার লেখনির ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং ফারসি অপরিহার্য মনে করে সমালোচনাহীন একবাক্যে মেনে নেওয়াটা ভুল পথে পা বাড়ানোর সামিল। এতে আফ্রিকার শিল্প ও সাহিত্যের অগ্রগতির কোনও সম্ভাবনা নেই। আশাকরি লেখকগণ যদি মনে না করেন যে আফ্রিকার সাহিত্য আফ্রিকার ভাষাতেই লেখা উচিৎ তাহলে তারা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বেন।” চয়িত এই বাক্য ক’টির ‘আফ্রিকা’ শব্দের স্থলে ‘বাংলাদেশ’ বসিয়ে পাঠ করতে বলি পাঠকদের। বিষয়টি বুঝতে বোধ করি আর কোন বাধা থাকবে না। আমি আমার ভাবের কিংবা চিন্তার প্রকাশ কেন মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় করবো? এমন দুর্মতি হবে কেন আমার? পৌনে দুইশত বৎসর ইংরেজরা এখানে রাজত্বের নামে লুটপাট করেছিল, তার সুমহান স্মৃতির তর্পণ করবো বলে? আমি আজও কাকাতোয়ার মতো ইংরেজি কপচাবো? এ তো ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিগ্রস্ততার অন্ধকারে নিজেকে নিমজ্জিত করে রাখা। উত্তর উপনিবেশী এই ব্যাধিগ্রস্ত মনকে স্বাদেশিকতা, স্বজাত্যবোধের উজ্জ্বল আলোকে পরি¯œাত করার সময় তো সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি আমরা। যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭১-য়ে যুদ্ধ করেছিলাম। এই ‘নেতৃত্ব’ শব্দটির যথার্থ প্রয়োগ হয়নি, দয়া করে এমন যেনো কেউ ভেবে না বসেন। মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর চার দশক পর কেউ কেউ এমনি ভেবে বসতে পারেন। যেহেতু দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন হয়ে গেছে, সে অনেক আগেই। সে অন্য প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নিয়ে এমন বিরোধাভাস সৃষ্টি করাটাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। এইরূপ মুক্তিযুদ্ধবিরোধীতাও জাতিগত সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বলে বিবেচিত হতে পারে, যেমন ‘নদী নিসর্গ’ এর স্থলে ‘রিভার ভিউ’ করলে এক ধরণের ভাষা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।
এই তোরণের চাদিতে ইংরেজি শব্দজুটি না বসিয়ে বাংলা শব্দজুটি বসাতে পারলে, সেটি হতে পারতো একটি লোক-ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ, হতে পারতো লোক জীবনের গভীরে প্রত্যাবর্তন। এই তোরণের চাদিতে সৃষ্ট ভাষিক নির্মাণ হতে পারতো সুরমা নদীর তীরে গড়ে উঠা সজলসবুজস্নিগ্ধ সংস্কৃতির পরিসর ভূমি সুনামগঞ্জের একটি মূর্ত প্রতীকী প্রকাশ কিংবা চিত্রকল্প। কিন্তু তা হয়নি। কবি আহসান হাবিব তার এক কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন, “ঢেউয়ে ঢেউয়ে ডানা বেয়ে নামে/ কী অতল সমুদ্রবিস্তার/ ঢেউয়ে ঢেউয়ে উচ্ছসিত নিজ নব প্রাণ-সবিতার/ সোনারঙ/” এখানে এই উচ্ছসিত সময়ে ঐতিহ্যের স্পর্শ কিংবা কোনও আভাস নেই, ঐতিহ্যেরে ডানা বেয়ে তাই কীছুই নামে না। সোনার বাংলার ‘সোনাররঙ’ এখানে ম্লান হয়ে থাকে ‘রিভার ভিউ’ শব্দজুটির মুন্সিয়ানায়। প্রাণ-সবিতার উদ্ভাস এখানে উধাও।
আমরা ট্রাফিক পয়েন্ট আর বক পয়েন্টের নাম বদলে দিয়েছি, দু’জন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার নামে। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালি। হোসেন বখ্ত চত্তর কিংবা আলফাত চত্তর নাম রাখার সময় বাংলা চত্তরকে নিয়ে এসেছি। তারও আগে আমরা পূর্বপাকিস্তানকে করে দিয়েছি বাংলাদেশ। জিন্দাবাদ না বলে বলি ‘জয়’। এর নামই ঐতিহ্যর নবনির্মাণ। আরও আরও বাঙালি হয়ে উঠা, হয়ে উঠা বাঙলা মায়ের সন্তান। ঐতিহ্যের নবনির্মাণ চাই প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্বাধীন দেশের, স্বাধীনচেতা জাতির এটাই রীতি। ভাষার প্রতিটি শব্দ দিয়ে তারা স্বদেশ, স্বজাতি ও আত্মবিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করে, বিশ্ব বরণীয় আর স্বরণীয় হয়ে উঠে। এই স্বপ্নই দেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রতিটি মানুষ। আমাদের কর্তব্য, এই সব শহিদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সকল প্রকার বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, প্রতিনিয়ত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে। এভাবেই আমরা আরও বাঙালি হয়ে উঠতে পারি। আর যারা পারে না, তারা অনায়াসে পিতৃ-মাতৃ-ভাতৃঘাতী হয়ে যেতে পারে, ক্রমে জঙ্গি হয়ে যেতে পারে। বাংলাতে জন্মে বাঙালিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ মানুষ থাকে না, অমানুষ হওয়াটাই একমাত্র তার নিয়তি। ইতিহাস তার স্বাক্ষী।