সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

জলবন্দী জীবনে ভয়ের অপর নাম ‘আফাল’



da0a91ea3a14524d9619ec48e51251cb-Sunamgonj

                     দুই হাওরের মাঝখানে শান্তিপুর গ্রাম। পশ্চিমে আঙ্গারুলি, পূর্বে খরচার হাওর। এখানকার মানুষের ছয় মাসই

                                                                 জলবন্দী জীবন কাটে।

খলিল রহমান::

চারদিকে হাওরের থই থই পানি। মাঝখানে ছোট্ট এক গ্রাম। দূর থেকে মনে হয় গ্রামটি জলের ওপর ভাসছে। গাছপালা তেমন নেই, নেই কোনো রাস্তাঘাট, স্কুল। ভরা বর্ষায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। গ্রামের মানুষের জীবন যেন বাঁধা হাওরে জলে, উথালপাতাল ঢেউয়ে।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামে বছরের ছয় মাসই জলবন্দী জীবন কাটে মানুষের। এখানে ৬০ থেকে ৭০টি পরিবারের বাস। ঘরবাড়ি কাঁচা, কোনোটিবা টিনের।

গ্রামটি দুই হাওরের মাঝখানে। পশ্চিমে আঙ্গারুলি, পূর্বে খরচার হাওর। গ্রামের লোকজন শুকনো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। আর বর্ষায় হাওরে মাছ ধরে জীবন চালাতে হয়। জলবন্দী জীবনে অভ্যস্ত হলেও হাওরের ‘আফাল’ নিয়ে যত ভয় তাদের। ঝড়ের সময় উত্তাল হাওরে যে ঢেউ ওঠে, এ জনপদের মানুষের কাছে সেটি আফাল। তখন বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রামের জামাল উদ্দিন (৪৮) জানালেন, আষাঢ় থেকে ভাদ্র—এই তিন মাস হাওরে পানি থাকে বেশি। ঢেউ থেকে বসতভিটা রক্ষায় প্রতিবছর চারপাশে বাঁশ দিয়ে আড় দিতে হয়। ফেলতে হয় মাটির বস্তা ও চাইল্যা বন। এবার এ কাজে তাঁর ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার টাকা। কিন্তু বন্যায় ঘর ও আড় দুটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার কীভাবে মেরামত করবেন, টাকা কোত্থেকে পাবেন—এই নিয়ে চিন্তায় আছেন।

জামাল উদ্দিনের স্ত্রী মাফিয়া বেগম জানান, গ্রামে কোনো স্কুল নেই। ২০ থেকে ২৫ জন ছেলেমেয়ে পাশের গ্রামের স্কুলে গিয়ে পড়ে। বর্ষায় নৌকাই ভরসা। নৌকা না পেলে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। যেদিন হাওরে ঢেউ বেশি থাকে, সেদিন বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো হয় না।

নারগিস বেগমের ঘরটি গ্রামের একেবারে উত্তর মাথায়। দেখলে মনে হবে, এই বুঝি হাওরের জলে ভেঙে পড়ল। নারগিস বলেন, ‘এত খারাপ ছিল না। ঢেউয়ের ধাক্কা এই অবস্থা করেছে। ভাত খাওয়ার উপায় নেই, মেরামত করব কীভাবে।’ তাঁর স্বামী আক্কেল আলী (৩৮) এই সময়ে হাওরে মাছ ধরেন। বললেন, ‘ঘর থেকে কয়েক শ গজ সামনে গিয়ে মাছ ধরা যায় না। ইজারাদারের লোকজন বাধা দেয়। আমরা এখন আর বর্ষায় ভাসান পানিতে মাছ ধরতে পারি না।’

একসময় হাওরে প্রচুর হিজল-করচের গাছ ছিল। এসব গাছ ঢেউয়ের সামনে বুক পেতে বাড়িঘর আগলে রাখত। এখন গাছগাছালি কমে যাওয়ায় সরাসরি ঢেউ আঘাত হানে বসতভিটায়। সবকিছু তছনছ করে দেয় বলে জানালেন গ্রামের আরেক বাসিন্দা আবদুল আলীম (৪০)। তিনি বলেন, গ্রামের পূর্ব দিকে সরকারি খরচার হাওরের পাড়ে একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে আফাল থেকে গ্রামটি রক্ষা পেত। কিন্তু কেউ তা করে না।