বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

হাওরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে



এস এম মুকুল:: 13709889_10209077264843100_8050388352507810263_n

ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে ধান এবং মাছের চাহিদা পূরণে যুগে যুগে অবদান রেখে আসছে ভাটিবাংলার মানুষ-হাওরবাসী। বাংলাদেশ আর প্রকৃতির অপরূপ লীলা নিকেতনের অসামান্য চারণভুমি ভাটিবাংলা খ্যাত হাওর অঞ্চল। বাংলাদেশের অনেক মানুষ জানেনরা হাওর বাসীর সুখ-দুঃখ, সমস্যা -সম্ভাবনার কথা। হাওরাঞ্চলে ৬/৭ মাস থাকে পানি। বাকি সময় শুকনো সবুজ প্রান্তর। একারণে শুকনার ৬ মাস শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন হাওরবাসীরা। এই এক ফসলের আয় দিয়ে সারা বছর চলে উদ্বৃত্ত থাকে সঞ্চয়। মৎস্য চাষ আর কৃষিভিত্তিক প্রকল্প গড়ে তোলার অপার দিগন্ত এই হাওরে। অনেকের ধারণা, হাওরের সোনার ফসল প্রতিবছর ঠিক মতো ঘরে তুলতে পারলে ১০ বছরে পাল্টে যাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা। দুঃখের বিষয় হলো- অসীম সম্ভাবনার এই হাওরাঞ্চলে কর্মসংস্থানের বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও ৫০ লাখের অধিক জনসংখ্যা বছরের ছয় মাস বেকার সময় কাটায়।

বর্ষায় যৌবনবতী হাওর সাগরের মতো অনন্ত অসীম জলাধার। দূরের আকাশ আর পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য হৃদয়কাড়া। হাওরে নৌকা ভ্রমণে চাঁদসুন্দর রাতের স্মৃতি জীবনে একবার গেঁথে নিলে আমৃত্যু সে তৃষ্ণা থেকে যাবে। বাংলাদেশের হাওরগুলোর আছে মনোমুগ্ধকর নাম যেমন- টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, টগার হাওর, মাটিয়ান হাওয়ার, দেখার হাওর, হালির হাওর, কড়চা হাওর, পাকনা হাওর, ধলা পাকনা হাওর, আঙ্গরখালি হাওর, খচ্চর হাওর, নখলা হাওর, সানুয়াডাকুয়া হাওর, শৈল চকরা হাওর, হৈশাম হাওর, বড় হাওর, হালিয়ার হাওর, চন্দ্রসোনার থাল হাওর, ডিঙ্গাপুতা হাওর প্রভৃতি। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিয়দংশ প্রভৃতি জেলার প্রায় পাঁচ হাজার হাওর-বাওর, বিল-ঝিল নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চল। হাওরাঞ্চলের জনসংখ্যা এক কোটিরও বেশি। হাওরবাসীর প্রায় ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠি কৃষিকাজ করে। বাকি ১০ ভাগের ৫ ভাগ মৎস্যচাষ আর ৫ ভাগ ব্যবসা, চাকরি ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত।

হাওরাঞ্চলে একটিমাত্র ফসল উৎপাদন হয়- যার নাম বোরো। বিরল বিচিত্র দেশি জাতের অনেক ধান এখনো এই হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। বছরে আড়াই লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য চাহিদা মেটায় হাওরবাসীরা। হাওর অঞ্চলের আরেক অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদের নাম মাছ। দেশের আহরিত মাছের শতকরা ২৫ ভাগ হাওরাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়। বছরে প্রায় ১০০ কেটি টাকার অধিক মাছ পাওয়া যায় হাওরে। প্রায় ৫০ বছর ধরে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা, তাহেরপুর, জামালগঞ্জ, টেকেরঘাট, খালিয়াজুরি ও মোহনগঞ্জ উপজেলার হাওর, বিল ও নদীর মাছ সেখানে বিক্রি করা হয়। হাওরের জলাবদ্ধ ভুমিতে জন্মে নল-খাগড়া, ইকরা, জিংলা, বাঁশ এবং প্রচুর বনজসম্পদ। এখানে আছে জলনিমগ্ন হিজল ও করচের বাগ। এসব উৎসকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যেতে পারে দেশীয় শিল্প কারখানা।

হাওরাঞ্চল যখন শুকিয়ে যায় তখন এর পানির সাথে বেড়ে ওঠা বাহারি প্রজাতির দেশীয় মাছ সব গিয়ে জমা হয় হাওরের নিম্নাঞ্চলে। যার স্থানীয় নাম ‘জলমহাল’। জলমহালে কি পরিমাণ মাছ থাকে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। জলমহাল ছাড়াও ফসলি জমির পাশে ডোবা, ছোট খাল, নালা সবকিছুতে ভরপুর থাকে মাছসহ অসংখ্য জাতের জলজপ্রাণী। হাওরাঞ্চলের জলরাশিতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নানা জাতের মাছ যেমন- কৈ, সরপুঁটি, পুঁটি, তিতপুঁটি, কাতলা, মাগুর, খৈলসা, বাঁশপাতা, আইড়, টেংরা, বাইম, চিতল, ভেদা, পাবদা, গজার, শোল, মহাশোল, চাপিলা, কাকিলা, বোয়াল, মৃগেল, রুই, কালবাউস প্রভৃতি। একসময় এসব জলমহালের মালিক ছিলো স্থানীয় জনগণ ও কৃষকরা। সেসময় বিল বা জলমহালের মাছ ধরতে পারতো জেলে ও সাধারণ মানুষ। এমনকি হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্তভাবে মাছ ধরার সুযোগ দেয়া হতো। আর এখন রাজনীতিবিদদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা গ্রাস করে নিয়েছে সকল জলমহাল। হাওর শুধু মাছ আর ধান নয়, পাখির জন্য অভয়ারণ্য এলাকা। শুকনো মৌসুমে বিশেষত শীতকালে দেশের বিরল প্রজাতির বহু পাখির দেখা মিলবে হাওরের বদ্ধ জলাশয়ে। হাওরের হিজল বাগে বসে পাখিদের মিলনমেলা। শীতকালে নীরব-নিস্তব্ধ বিশাল হাওরে পাখির কলরব আর মাছের বুদবুদে হাওরের নীরবতাও সাঙ্গ করে। বর্ষায় হিজল-করচ ও নলখাগড়ার বুক অবধি হাওরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে মেতে উঠে প্রেমখেলায়।

সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ছোট বড় ৫১টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত টাঙ্গুয়ার হাওরকে সম্পদ ও সৌন্দর্যের রাণী হিসেবে অভিহিত করা হয়। পরিবেশবাদীদের গবেষণা রির্পোট অনুযায়ী, বিশ্বে বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির ২ শতাধিক পাখির অভয়াশ্রম এবং বিপন্ন ১৫০ প্রজাতির মাছের সমাগম এই টাঙ্গুয়া হাওরে। টাঙ্গুয়ায় রয়েছে স্তন্যপায়ী দুর্লভ জলজ প্রাণী গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), খেঁকশিয়াল, উঁদ, বনরুই, গন্ধগোকুল, জংলি বিড়াল, মেছো বাঘ। আরো রয়েছে নলখাগড়া, হিজল, করচ, বরুণ, রেইনট্রি, পদ্ম, বুনো গোলাপসহ ২০০ প্রজাতিরও বেশি গাছ গাছড়া। যা থেকে জ্বালানি কাঠ, আসবাবপত্রসহ গৃহ সামগ্রী ও সৌখিন শোপিস তৈরির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়।

13876597_10209210014441757_6572422565313750423_n

হাওর যদিও সম্ভাবনার ক্ষেত্র- তবে এই হাওরবাসীর আছে অনেক দুঃখগাঁথা। আর্থিক দুরাবস্থা, স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর বিদ্যুৎহীনতার মতো বহুমুখি জটিল সমস্যায় জর্জরিত হাওরাঞ্চলের মানুষ। বিশেষত মধ্যবিত্তদের না ঘরকা না ঘটকা অবস্থা। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওরবাসী কৃষকদের সকল সুখ-স্বপ্ন-সাধ বানের পানিতে ভেসে যায়। ঋণ, কর্জ, লগ্নি আর খেয়ে না খেয়ে কষ্টার্জিত ফসল তলিয়ে গেলেও কৃষক কিছুই করতে পারেনা। প্রায় প্রতি বছরই তাদের এ রকম দুঃসহ দুর্ভোগ-দুর্ভাবনার মুখোমুখি হতে হয়। বাঁধ তৈরি আর সংস্কারের নামে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে নয়ছয় করা হলেও হাওর রক্ষা বাঁধগুলোকে স্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হয়না।

হাওরের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। প্রচার-প্রচারণা ও লেখালেখি হওয়া দরকার। ২০০৮ সাল থেকে হাওর উৎসবের ধারাবাহিকতায় কি পেয়েছে হাওরবাসী? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাওরবাসীর সন্মানে ঢাকা-মোহনগঞ্জগামী আন্তঃনগর ট্রেনের নাম দিয়েছেনÑ ‘হাওর এক্সপ্রেস’। এটি এখন হাওরবাসীর ইতিহাসের অংশ। হাওরের উন্নয়নে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগসমূহের সমন্বয়ের অভাবে স্থায়ী ও কার্যকরী সুফল পাচ্ছেনা হাওরবাসী। দেশের জাতীয় উন্নয়নে হাওরবাসীর অবদান, সম্পদের অপর সম্ভাবনা এবং বিপুল ভোটব্যাংক থাকা সত্ত্বেও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কেন হাওরাঞ্চল স্থান পায়না সে প্রশ্নের জবাব কে দিবে?

হাওররাঞ্চল উন্নয়নে সরকারের জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে:

১. হাওরবাসীদের ফসল রক্ষার জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাজা-মজা পুকুর-ডোবা কাজের বিনিময়ে খাদ্যে কর্মসূচির আওতায় খনন করতে হবে।

২. নদীর দু’পাড়ে, হাওরের পতিত উচু জমিতে, গ্রামের চারপাশে ব্যাপক হারে পানি সহিষ্ণু বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মিটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। প্রচুর খাবার মিলবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে।

৩. ঢেউ-এর আঘাতে অরক্ষিত ভিটেবাড়ী রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. শুধু ধান চাষে নির্ভরশীল না করে হাওরবাসী কৃষকদের বহুমুখী চাষাবাদে আগ্রহী করতে হবে।

৫. পাহাড়ি বোর্ডের ন্যায় হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে।

৬. হাওর মৎস ও কৃষি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে।

৭. হাওরাঞ্চলের অবস্থা, প্রকৃতির ধরণ, অবকাঠামোর বৈশিষ্ঠ্য নিরূপণ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী অবকাঠামোগত ব্যবস্থা এবং ভাসমান/ভ্রাম্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৮. হাওরাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে।

৯. ঋণ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প চালু করতে হবে।

১০. হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটন ব্যবস্থা করতে হবে।

12993561_10208826131227921_1989847962795756330_n

১১. এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে হাওর ইউনিভার্সিটি বা ভাটিবাংলা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা যেতে পারে।

১২. দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাওরাঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও পাঠ পরিক্রমা চালু হতে পারে।

১৩. হাওর এলাকার হাজার বছরে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবন-সংগ্রাম প্রভৃতির সংরক্ষণে সেখানে একটি ‘হাওর মিউজিয়াম’ করা অত্যাবশ্যক।

১৪. হাওরে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক বিদ্যুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

১৫. নারীদের কর্মমুখি করে গড়ে তুলতে হবে। হাস, মুরগি, কবুতরসহ গৃহপালিত পশু পালন, সবজি উৎপাদন, মুড়ি, চিড়া, খৈ তৈরি ও প্যাকেটজাতকরণ, শুটকি তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্ত ও কুটিরশিল্পখাতে নারীদের নিয়োজিত করা যেতে পারে।

১৬. বর্ষায় হাওরের পানিতে। নির্দিষ্ট স্থানে ঘের করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে এই পোনা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার পর মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে। মুক্ত জলাশয়ে ঘের পদ্ধতিতে মাছ চাষ এবং ভাসমান সবজি চাষের কথা ভাবা যেতে পারে।

১৭. শুকনা মৌসুমে দেখা যায় মাঠের পর মাঠ। ঘাস আর ঘাস। এই ঘাস আর মাঠকে কেন্দ্র করে দুগ্ধ খামার, গরু মোটাতাজাকরণ ও ছাগল প্রকল্প করা যেতে পারে। তবে দুগ্ধ খামারের ক্ষেত্রে বর্ষায় গরুর বিকল্প খাবারের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

১৮. শুকনা সময়ে পতিত চট্টন এলাকাকে কী করে উৎপাদনশীল হিসেবে তৈরি করা যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে পুরো ৬ মাসে উপযোগি সবজি ও শস্য উৎপাদনের কথা ভাবা যেতে পারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক, lekhokmukul@gmail.com