শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

আনিসুল হক স্যার ও কিছু অপ্রত্যাশিত বক্তব্য



রিচার্ড দত্ত রনি::13631651_1169374563106824_6961402500744616601_n

আনিসুল হক, নামটা বলার পরে বিশেষণের তেমন কোন প্রয়োজন পরে না। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক, নাট্যাকার, কবি, বহুল প্রচারিত দৈনিকের সহযোগী সম্পাদক তিনি। দেশের বাইরেও তাঁর লেখালেখির প্রশংসা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর “বিশ্ববিদ্যালয় কুয়োর ব্যাঙ বানাবে না” শিরনামে একটি লেখা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। অনেকেই এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, ক্ষমাও চাইতে বলছেন। আনিসুল স্যারের মত লোকের সম্পর্কে বলার সাহস বা যোগ্যতা কোনাটাই আমার নাই, কিন্তু দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ না করে থাকতে পারছি না।
একে একে আমি স্যারের বক্তব্যের উত্তর দিচ্ছিঃ
একঃ
স্যার দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাব্যাবস্থা ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা করেছেন, আসলে সমালোচনা বললে ভুল হবে তিনি একতরফা-ঢালাওভাবে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধুইয়ে দিয়েছেন!
এইকথা সত্য অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের আয়তন এত ছোটযে, স্যার তাদের কুয়োর সাথে তুলনা না করে পারেননি। কিন্তু এই কুয়োগুলুকে অনুমোদন দেবার দায়টা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এড়াতে পারে?
দুইঃ
স্যার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নামের সামনে ড. বসানোর যে অভিনব উপায় বলেছেন তা মানতে পারলাম না। আনিসুল সাহেবের মতে দরকার হলে হোমিওপ্যাথির ডাক্তার এনে ভিসি করা হবে, তাহলেওতো নামের সামনে ড. থাকবে। দেশের হাতে গোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রির কথা আমারা আতিতে জেনেছি এবং উনারা কেউই বর্তমানে ক্ষমতায় নেই, সবাই অপসারিত হয়েছেন।
তিনঃ
আনিসুল সাহেবের মতে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধুমাত্র উজিসি নির্ধারিত বই পড়ানো হয়। জ্ঞানের আলো যে ঐ বইগুলোতে সীমাবদ্ধ নয় তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুঝেই না!
বাস্তব কথা কি জানেন স্যার, চার মাসের দৌড়-ঝাঁপ তো, একাডেমিক বিষয়গুলিই ঠিক মত পড়া যায়না, গণ্ডির বাইরে গিয়ে রবিঠাকুর কিংবা শেস্কপিয়ার- স্টিপেন হকিংস পরার উপায় কই?
আর যদি দেশের সবচেয়ে সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরি তাইলে বলতে হয় ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেরা সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু ওইখানে গণ্ডির বাইরের জ্ঞানচর্চা কতটুকু হয় বলা কঠিন। কারন দু একবার ওই প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরীতে ঢোকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ওই খানে একাডেমিক পড়ার বাইরে অনেক পরাশুনা হয় কিন্তু পড়াশুনায় মগ্ন বেশিরভাগ্যের উদ্দেশ্য কি জ্ঞান অর্জন নাকি বিসিএস অথবা ব্যাংক জব প্রাপ্তি বুঝতে পারিনি।
চারঃ
স্যারের মতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট নির্ধারিত হয় টিউশন ফিস বা সোজা বাংলায় টাকার উপর ভিত্তি করে। বেশি টাকা দিলে ৪.০ আর কম দিলে ২.৫ মানে টাকা দিলে সবই পাওয়া যায় ওই সব প্রতিষ্ঠানে!
আনিস স্যার আপনারা দেশের বুদ্ধিজীবীশ্রেণী। আপনাদের কথায় মানুষ অনুপ্রাণিত হয়, কঠিন বিষয় সহেজে বুঝতে পারে। আপনারা যখন একটা বিশেষ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের নিয়ে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এমন মন্তব্য করেন তখন সাধারণ মানুষ কি বুঝবে? আপনি এমন কয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে পারবেন যেখানে টাকার বিনিময়ে রেজাল্ট বা সার্টিফিকেট পাওয়া যায়? দেশে কয়েকটি লালদাগে চিহ্নিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিতরন করে। সেটা কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু যখন ঢালাওভাবে বলা হবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে
টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, তাও আবার আনিসুল হকের মত ব্যাক্তির মুখে মানুষ কি বিভ্রান্ত না হয়ে পারে?
পাঁচঃ
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কথা হচ্ছে আনিসুল হকের মতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে শিক্ষার্থী ফার্স্ট ক্লাস ফাস্ট হয়ে বেরুবে তার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে- মলে কিংবা টি এস সি তে যে ৫ বছর শুধুমাত্র হাঁটাহাঁটি করবে সেই বেশি খাঁটি/ভাল মানুষ হবে! এটা কি বললেন স্যার, এটা কি আপনি অজান্তেই অনুধাবন করেছেন নাকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ব্যাক্তিগত আক্রশের প্রতিফলন ঘটালেন বুঝলাম না।
সবার শেষে একটি কথা বলতে চাই দেশে এখন এমন এক সময় চলছে যখন জঙ্গী কর্মকাণ্ডের সাথে দেশের বড় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা প্রথমিকভাবে পাওয়া গেছে। এত করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধরন শিক্ষার্থীরা বিপাকে পরেছে। এমন অবস্থায় আনিসুল স্যারের এমন মন্তব্য মোটেও কাম্য ছিলনা। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- শিক্ষক দেশদ্রোহী কাজে লিপ্ত আছেন, এটা যেমন সত্য এমন অনেক উধাহরণও আছে যেখানে এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরিক্ষায় এসব কুয়োর ব্যাঙরাই ফার্স্ট হচ্ছে, ডিস্টিংশন নিয়ে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পি এইচ ডি করছে! এমনকি দেশের সেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কৃতিত্বও দেখিয়েছে এসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
একটা প্রতিষ্ঠানে সবাই যে ভাল হবে এমনটি আশা করা বোকামি বৈকি। ভাল-মন্দ প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে, তা সে পাবলিক হোক বা প্রাইভেট। অল্প কিছু মন্দের জন্য ভালদেরও ঢালাওভাবে কঠাক্ষ করা অবিচার নয় কি? উদাহরন হিসাবে বলতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তৈরি করেছে, তেমনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ- যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত অনেকই এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন। এর মানে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যুদ্ধাপরাধী তৈরির কারখানা ছিল? এমনটি নিশ্চই নয়।
ছোট মুখে অনেক বড় কথা বলে ফেলেছি। আমার কথাগুলু হয়ত অনেকের ভালও লাগেনি। তবুও বিবেকের তাড়নায় বলতে বাধ্য হয়েছি। ভুল হলে মাফ করবেন।
ধন্যবাদ।