বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

আইএস এর পেছনে আসলে কে?



171742Two_and_ahalf_months_after_the_latest_avatar_of_a_long_copy২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস যে নৃশংসতা ও তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে তার সঙ্গে শুধু মধ্যযুগে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ফ্রান্সের তথাকথিত ধর্মদ্রোহী ক্যথারদের ওপর যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন তারই তুলনা হতে পারে। তবে আইএস এতোটা উন্মত্ত হয়ে ওঠার অনেক আগেই অন্তত একজন মানুষ এই জঙ্গি সংগঠনটির কোমর ভেঙ্গে দিতে পারতেন। আর তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর মার্কিন সাংবাদিক স্টিভেন সটলফকে হত্যার আগ পর্যন্ত ওবামার টনক নড়েনি। অথচ সেই ২০০৬ সালে জঙ্গি সংগঠনটির জন্মকাল থেকেই এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা বিভ্রান্ত ছিল। আসলে আইএসকে এভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়ার পেছনে মার্কিন প্রশাসনেরও পরোক্ষ মদদ ছিল। ২০০৪ সালে আবু মুসাব আল জারকাওয়ি ইরাকে আল কায়েদার শাখা আল কায়েদা ইন ইরাক (একিউআই) প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৬ সালে তার নেতৃত্বেই একিউআই ইরাকের শিয়াদের বিরুদ্ধে একটি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করে। ২০০৬ সালের ৭ জুন আবু মুসাব আল জারকাওয়ি মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হয়। এরপর একিউআই এর নেতৃত্বে আসে আবু আইয়ুব আল মাসরি, সে আবু হামজা আল মুহাজের নামেও পরিচিত।

২০০৬ সালের অক্টোবরে আবু আইয়ুব আল মাসরি ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক (আইএসআই) গঠনের ঘোষণা দেয়। আর এর প্রধান করা হয় আবু ওমর আল বাগদাদিকে। ২০১০ সালের এপ্রিলে আবু আইয়ুব আল মাসরি ও আবু ওমর আল বাগদাদি মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হলে আবু বকর আল বাগদাদি আইএসআই এর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়। ২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল আইএসআই সিরিয়ায় আল কায়েদার অঙ্গ সংগঠন জাবহাত আল নুসরা বা নুসরা ফ্রন্টকেও নিজেদের অঙ্গীভুত করে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। আর আল বাগদাদি ঘোষণা করেন এখন থেকে তার সংগঠনের নাম হবে ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। এর মধ্য দিয়ে সংগঠনটির আরো উচ্চাভিলাষি মনোভাব প্রকাশ পায়। কিন্তু আল নুসরা ফ্রন্ট আইএসআইএস এর প্রতি আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। এবং জঙ্গি সংগঠন দুটির মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। কয়েক মাসের সংঘাতের পর ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আল কায়েদা আইএস এর সঙ্গে সব ধরনের সংযোগ ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালের মে থেকে শুরু হয় আইএস এর চুড়ান্ত তাণ্ডব। ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক শহর দখল করে নিতে থাকে আইএস। ২০১৪ সালের সেপ্টম্বরের মধ্যেই ইরাক ও সিরিয়ার প্রায় অর্ধেক আইএস এর দখলে চলে যায়। অথচ আইএস এর অগ্রগতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় তেমন কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। বসে বসে যেন শুধু তামাশা দেখছিল। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের গালে একের পর এক চড় মারতে শুরু করলো আইএস।

২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলি ও ২ সেপ্টেম্বর স্টিভেন সটলফকে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে প্রকাশ করে আইএস। অথচ ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট ওবামা হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইএসকে একটি ছোটখাটো হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যা সকলকে বিস্মিত করেছে। যাইহোক, এরপর ওবামা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে মিলে আইএস এর ক্ষমতা খর্ব করার পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেন। এই আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় অবিশ্বস্ত শেখশাসিত রাষ্ট্রগুলোসহ তুরস্কের মতো দেশও। পাশাপাশি ওবামা ইরাক ও সিরিয়ার সাধারণ সুন্নীদের জন্যও একটি নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলেন। কিন্তু আইএসকে ঠিক কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তার কোনো স্পষ্ট রুপরেখা প্রকাশ করেননি ওবামা। এসব থেকে এই ধারণা করাটাই যুক্তিযুক্ত ঠেকে যে, আইএস বা আবু বকর আল বাগদাদি মূলত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জোটেরই সৃষ্টি। ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই বাহরাইনের দৈনিক পত্রিকা গালফ ডেইলি নিউজ জানায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেন ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নাকি বলেছেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই আবু বকর আল বাগদাদিকে তৈরি করেছে। পুরো বিশ্বের চরমপন্থী কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম এমন একটি সন্ত্রাসী সংগঠন সৃষ্টিতে বাগদাদিকে তারাই মদদ যুগিয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নাকি পশ্চিমারা আইএস সৃষ্টি করে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আইএস এর প্রতি নিবদ্ধ করে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই কৌশলের নাম দেওয়া হয় হর্নেস্ট নেস্ট। স্নোডেনের দেওয়া তথ্য থেকে নাকি এও জানা গেছে যে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পুরো এক বছর ধরে আবু বকর আল বাগদাদিকে উচ্চ মানের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন চারদিনের মাথায় এ দাবি নাকচ করে দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের দাবি, ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালি পত্রিকা কায়হানের সম্পাদকও নাকি ইরনার এহেন প্রচারণাকে নাকচ করে দিয়েছেন। তবে গালফ ডেইলি নিউজ এর দাবির বিরোধীতা করে কিছু বলেননি এডওয়ার্ড স্নোডেন নিজে। উইকিলিকস অবশ্য ২০১৪ সালের ৮ আগস্ট এক টুইটার বার্তায় জানিয়েছে, “সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মতো আইএসআইএসও ইসরাইলের সহায়তা পেয়ে থাকতে পারে। কিন্তু স্নোডেনের ফাঁস করা নথিপত্রে বিষয়টির কোনো উল্লেখ নেই।”

তবে ইরনা ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই বিষয়টি ফাঁস করার আগে অ্যালগেরিয়েল ওয়ান ডটকম নামের একটি সাইটে ১১ জুলাই এই খবর প্রকাশিত হয়। আর ইরনা সেখান থেকেই তাদের প্রতিবেদনটি তেরি করে। ওদিকে ৫ জুলাই বাগদাদির একটি ভিডিও বক্তব্য প্রচারের পর বিশ্বব্যাপী তাকে সনাক্তের তোড়জোড় শুরু হয়। এসময়ই মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইনের সঙ্গে বাগদাদির একটি গোপন বৈঠকের ছবি প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালের ২৭ মে সিরিয়ার ইদলিবে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাগদাদির সঙ্গে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির পাঁচ ‘মডারেট’ বিদ্রোহী নেতাও উপস্থিত ছিলেন। এর এক মাস আগেই মাত্র বাগদাদি তার সংগঠনের নাম ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক (আইএসআই) থেকে বদলে ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) করেন। ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) স্বঘোষিত ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল’ সলিম ইদ্রিস ম্যাক কেইনের ওই সিরিয়া সফরের আয়োজন করে। সিরিয়ার মডারেট বা গণতন্ত্রপন্থী বিদ্রোহী সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার জন্য গঠিত অলাভজনক মার্কিন সংগঠন সিরিয়ান ইমার্জেন্সি টাস্ক ফোর্সও (এসইটিএফ) ম্যাককেইনের ওই সফর আয়োজনে সহায়ক ভুমিকা পালন করেছে। তবে অনেকের মতে, ম্যাককেইন বাগদাদির সঙ্গে বৈঠক করার মতো এতো বড় ভুল করার মতো লোক নন। কারণ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পরররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বাগদাদির মাথার মূল্য বাবদ ১০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ওই বৈঠকে এমনকি আল কায়েদার সিরিয় ও লেবাননী শাখা জাবহাত আল নুসরা বা নুসরা ফ্রন্টের অঙ্গসংগঠন নর্দান স্টর্ম এর দুই নেতা মোহাম্মদ নুর ও আম্মার আল দাধিকি ওরফে আবু ইব্রাহিমও উপস্থিত ছিল। ম্যাককেইন কি জানতেন তিনি যাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তাদের সকলেই মডারেট সুন্নী বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন না বরং এদেরই কতিপয় আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুনি ও ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের নেতা? সম্ভবত না।

কিন্তু ম্যাককেইনকে সেখানে নিয়ে গেছে যে সংগঠন- সিরিয়ান ইমার্জেন্সি টাস্ক ফোর্স (এসইটিএফ), সেটি সম্পর্কেও একই কথা বলা সম্ভব নয়। এসইটিএফ খুব ভালো করেই জানতো কাদেরকে ম্যাকেকেইনের সঙ্গে আয়োজিত ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আর সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মডারেট’ ও ‘জঙ্গি’ বিদ্রোহীদের মধ্যে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বলে যে খুব একটা ফারাক করা হয় না তাও জানতো এসইটিএফ। অথচ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও সিনেটর জন ম্যাককেইনসহ ওয়াশিংটনের বেশিরভাগ নীতি নির্ধারকই সিরিয়ার গণতন্ত্রপন্থী ও মডারেট সুন্নী বিদ্রোহীদেরকে ‘ভালো’ বিদ্রোহী আর ইসলামপন্থী জঙ্গি বিদ্রোহীদেরকে ‘খারাপ’ বিদ্রোহী হিসেবেই জেনে আসছেন, অন্তত এসইটিএফ এর তরফে। সিরিয়ায় ম্যাককেইনের সফরের এক পক্ষকাল পরেই আবু সাক্কার নামের এক সন্ত্রাসী নেতা সিরিয়ান সেনাবাহিনীর এক সদস্যের হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিড়ে খুড়ে বের করার দৃশ্য ভিডিও করে অনলাইনে পোস্ট করে। আবু সাক্কার কথিত মডারেট ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সঙ্গে জোট বেধে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বিষয়টি নিয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির নেতা ইদ্রিসকে প্রশ্ন করেন বিবিসির পল উড। উত্তরে ইদ্রিস বলেন, “পশ্চিমারা কি আমাকে এখন আবু সাক্কারের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে বলছে এবং তাকে বিপ্লব থেকে সরিয়ে দিতে বলছে?” মার্কিন সংস্থা সিরিয়ান ইমার্জেন্সি টাস্ক ফোর্সও (এসইটিএফ) সিরিয়ার মডারেট বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইসলামি সন্ত্রাসীদের সংযোগের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। এসইটিএফ আরো জানায় সৌদি আরব, জর্দান এবং ফ্রান্সের মতো অন্যান্য মিত্র দেশগুলোও ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। সূতরাং এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি এখন অকার্যকর একটি বিদ্রোহী সংগঠন ও জঙ্গিদের আখড়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু, এসইটিএফ কেন বাশার আল আসাদের সরকারকে উৎখাতে মডারেট বা জঙ্গি যে কারো সঙ্গেই হাত মেলাতে কসুর করছে না? এই প্রশ্নের উত্তরেও ফের ইসরাইলের প্রসঙ্গটি চলে আসে। এসইটিএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রধান তদবিরকারী সংস্থা (লবিস্ট) অ্যামেরিকান ইসরায়েল পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির (এআইপিএসি) মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এসইটিএফ নিজের লক্ষ্য-উদ্দ্যেশ্য হিসেবে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি শাসকদের বিরুদ্ধে অন্যদিকে শিয়া ও সুন্নী চরমপন্থার বিরুদ্ধে সাধারণ গণতন্ত্রমনা জনগনকে শক্তিশালি করার জন্য কাজ করার কথাই বলছে। অবশ্য, এতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা আরো সুসংহত হবে বলেই এসইটিএফ এর ধারণা। যা ইসরায়েলের পক্ষেও কখনো করা সম্ভব নয় বলেই মনে করে এসইটিএফ। ইসরায়েল বিশ্বের একমাত্র দেশ যে তার নিরাপত্তার জন্য পুরো আরব বিশ্বকেও ধ্বংস করতে পিছপা হবে না।

১৯৯০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত একটি পরামর্শক গ্রুপ ‘মধ্যপ্রাচ্যে আরো শান্তি প্রতিষ্ঠা’র জন্য নেতানিয়াহুর কাছে একটি পরিকল্পনা পেশ করেছিল। ইসরায়েলের প্রতি ওই পরিকল্পনার প্রধান পরামর্শগুলো ছিল- ইরাককে ধ্বংস করা, সিরিয়াকে তোলপাড় করা আর দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে একঘরে করে ধ্বংস করা। এরপর জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসন উৎখাত করা হয়। যদিও সাদ্দাম হোসেনের বাথপার্টি ও সরকার কড়া সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ ছিল তথাপি তাদের বিরুদ্ধে ইসলামি সন্ত্রাসবাদে মদদ যোগানোর অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু ইরাক ধ্বংস হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্য আরো অস্থির হয়ে ওঠে। ইরাককে ধ্বংসের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ইসরায়েল বুঝতে পারল যে, সে উত্তপ্ত কড়াই থেকে এবার জ্বলন্ত উনুনের আগুনে ঝাঁপ দিয়েছে। আগে যেখানে লেবানন ও ইরানের মধ্যে একটি বাফার স্টেট বা মধ্যবর্তী দেয়াল হিসেবে কাজ করতো সাদ্দাম হোসেনের ইরাক। সেই ইরাকই নুরী আল মালিকির অধীনে একটি খোলা ময়দানে পরিণত হয়েছে। ফলে এখন ইরান থেকে অবাধে লেবাননের শিয়া জঙ্গি সংগঠন হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্রের চালান যাচ্ছে। এতে ইরান থেকে ইরাক হয়ে লেবানন পর্যন্ত যে শিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে ইসরায়েল এর নাম দেয় ‘শিয়া ক্রিসেন্ট’। ২০০৬ সালে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার জন্য লেবাননে হামলা চালায়। এর একমাস আগে একইভাবে ফিলিস্তিনের হামাসের ওপরও হামলা চালায় ইসরায়েল। কিন্তু হিজবুল্লাহর ওপর ওই হামলা ইসরায়েলের জন্য কুটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিপর্যয় হয়ে দেখা দেয়। কারণ ইতিমধ্যেই হিজবুল্লাহ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালি হয়ে উঠেছে। এরপর থেকেই ইসরায়েল ‘শিয়া ক্রিসেন্ট’ এর আতঙ্কে মৃত্যুর প্রহর গুনতে শুরু করে। এবার হিজবুল্লাহকে দমাতে ইরানের সঙ্গে এর যোগাযোগ বন্ধ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এর জন্য দুটি পথ খোলা আছে- হয় ইরানকে ধ্বংস কর আর নয়তো সিরিয়াকে ধ্বংস কর। কিন্তু ইরান অনেক বড় এবং শক্তিশালি দেশ। এমনকি বুশও ইরানে হামলা করার সাহস করেননি। কিন্তু সিরিয়া তার চেয়ে অনেক ছোট দেশ যাকে সহজেই অস্থিতিশীল করা সম্ভব। ফলে ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সচিব জেফরি ফেল্টম্যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি আরবের অতি ক্ষমতাবান রাষ্ট্রদূত প্রিন্স বন্দর বিন সুলতান মিলে আরেকটি পরিকল্পনা করেন। জেফরি ফেল্টম্যান একজন ইহুদিবাদি এবং ইসরায়েলেও দুই মেয়াদে কাজ করেছেন। নতুন এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয় ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে আরো শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা’। এই পরিকল্পনায় তুরস্ক থেকে শুরু করে জর্ডান পর্যন্ত একটি ‘সুন্নী ক্রিসেন্ট’ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়। এর লক্ষ্য, শিয়া ক্রিসেন্টটিকে ভেঙ্গে ফেলা। এই পরিকল্পনার মূল টার্গেট সিরিয়ার স্বৈরশাসক আসাদের বাথপন্থী ও সেক্যুলার সরকার। সিরিয়ার ৭০% মানুষ সুন্নী।

২০১১ সালে সিরিয়ায় আরব বসন্ত শুরু হওয়ার আগে দুই বছর ধরে ৫১টি টিভি চ্যানেল ও রেডিও স্টেশন আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে সালাফি মতাদর্শ ও ঘৃণার প্রচারণা চালায়। এই টিভি ও রেডিওগুলো সব সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত ছিল। এদিকে ২০১৪ সাল থেকে ওবামা ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করার যে মনোভাব প্রকাশ করে আসছে এতে ইসরায়েল আরো ঘাবড়ে যায়। আর ওই আতঙ্ক থেকেই হয়তো ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজা ভুখণ্ডে ধ্বংসযজ্ঞ চলায়। কিন্তু গাজা হামলাও ইসরায়েলকে লেবাননে হামলার মতো হিতে বিপরীত ফল এনে দেয়। গাজায় হামলার ফলে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে এতোটাই কোনঠাসা হয়ে পড়ে যা একবছর আগেও কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। তবে গাজা হামলার ফলেই সম্ভবত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সিরিয়ায় আলকায়েদার অঙ্গ সংগঠন জাবহাত আল নুসরা বা নুসরা ফ্রন্ট সিরিয়া-ইসরায়েল সীমান্তের কুনেইত্রা শহরটি দখল করে। নুসরা ফ্রন্টকে আইএস ইতিমধ্যেই সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেছিল। ফলে নুসরা ফ্রন্ট এখন সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তেই নিজেদের জড়ো করছে। এর মানে হলো আল কায়েদাও ইরাক-সিরিয়াকে আইএস এর হাতেই ছেড়ে দেওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেছে। আল কায়েদা এখন জর্ডান ও ইসরায়েলের দিকে মনোযোগ দেবে। আজ হোক বা কাল ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো ইসরায়েলের ওপরও নজর ফেলতে বাধ্য হবে। কারণ আল কায়েদার মতো সালাফি ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠনগুলোর চুড়ান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে মুক্ত করে আল আকসা মসজিদকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। কেননা আল আকসা মসজিদ সকল সত্যিকার মুসলিমের কাছেই কাবা ঘরের পর দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এতোটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, ইহুদিবাদি এই দেশটি বুঝতেই পারেনি সিরিয়াকে ধ্বংস করলে ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে তার সর্বশেষ নিরাপত্তা দেয়ালটিও ধ্বসে পড়বে! আর সিরিয়া যদি একবার পুরোপুরি ধ্বসে পড়ে তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যই উত্তাল হয়ে পড়বে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলোর তরুণরা নিজেদেরকে তাদের দেশের সরকার ও আর্থ-সমাজিক ব্যবস্থার দ্বারা অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছে ভাবছে তাদের সকলেই হয়তো আইএস আর নয়তো আল কায়েদার অঙ্গ সংগঠন জাবহাত আল নুসরা বা নুসরা ফ্রন্টে দলে দলে যোগ দেবে। যাদের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে জেরুজালেমের ওপর একটি চুড়ান্ত আঘাত হানা। আর সত্যিই সত্যিই যদি তেমনটা ঘটে তাহলে ইসরায়েলসহ পুরো বিশ্বেরই বেশিরভাগ অঞ্চলে (ভারত ও পাকিস্তানসহ) মানব জীবন সত্যিকার অর্থেই “বিপজ্জনক, নিষ্ঠুর ও সংক্ষিপ্ত” হয়ে আসবে! তেহেলকা ডটকমে প্রকাশিত প্রেম শংকর ঝাঁ-র নিবন্ধ ‘হু ইজ রিয়েলি বিহাইন্ড দ্য ইসলামিক স্টেট’ অবলম্বনে