শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

কিছুতে নেই বিএনপি, সবকিছুতে আওয়ামী লীগ!



2479bbb50349d8c478dfe9c105cc7b94-3গত বুধবার প্রথম আলোতে ‘কিছুতেই নেই বিএনপি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দল গোছানো কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তার কোনোটাই তাঁরা রক্ষা করতে পারেননি। একটি বড় দল পরিচালনা করতে নেতাদের মধ্যে যে নিয়মিত আলোচনা ও পরামর্শ করা এবং সমন্বয় থাকা প্রয়োজন, তাও বিএনপিতে নেই। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভিযোগ, তাঁদের অবজ্ঞা করা হচ্ছে, কর্মসূচি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের মতামত নেওয়া হয় না। আর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মনে করেন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের ভীরুতা ও আপসকামিতার কারণেই ২০১৫ সালে তিন মাসব্যাপী আন্দোলন সফল করা যায়নি। নয়াপল্টনে দলীয় অফিসের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ঢাকার বাইরে আন্দোলন সফল হয়েছে। কিন্তু ঢাকার নেতা-কর্মীরা মঠে নামেননি। ‘ব্যর্থতার দায়’ নিয়ে দলে এখনো সন্দেহ-অবিশ্বাস রয়েছে।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চলতি বছরের মার্চ মাসে বিএনপি একটি ‘সফল’ কাউন্সিল করতে পেরেছে, দাবি নেতাদের। সারা দেশের নেতা-কর্মীরা ঢাকায় এসে নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কাউন্সিলের তিন মাস পরও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি, বেশির ভাগ সহযোগী সংগঠনের কমিটি ঘোষণা না করায় তাঁদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিএনপির রাজনীতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন—এমন কয়েকজন বিশ্লেষক জানিয়েছেন, বিএনপিতে এখন তিনটি ধারা দৃশ্যমান। এর একটি হলো দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কট্টর অবস্থানের অনুসারী। তাঁরা মনে করেন, বিএনপি সঠিক পথেই ছিল এবং আছে। ২০১৩-১৪ বা ২০১৫ সালের আন্দোলন ভুল ছিল না। আন্দোলন করেই এই সরকারকে হটাতে হবে। প্রয়োজনে দলের নিষ্ক্রিয় নেতাদের বাদ দিতে হবে।
দ্বিতীয় ধারার মতে, তারেকের উগ্রনীতি ও অবাস্তব কর্মসূচির কারণে দল ডুবেছে। অতএব, তাঁকে কিছুদিন বিএনপির রাজনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত। এই দুই বিপরীতমুখী ধারার মাঝখানে যে তৃতীয় ধারা, তারা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় সত্যিকার অর্থে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। নির্বাচন ও আন্দোলনের বিষয়েও এই ধারা এখনই মাঠ গরম না করে জনগণকে সম্পৃক্ত করে ধীরেসুস্থে এগোতে চায়।
মত ও পথ নিয়ে দলের চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানের মধ্যে টানাপোড়েনের কথাও শোনা যায়। সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির সভায় খালেদা জিয়া নিজেই কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, ‘অনেকে বলেন তারেকের সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সব অপপ্রচার। বৈঠকে আসার আগেই তো তার সঙ্গে আমার কথা হলো।’
বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে দূরত্ব বাড়ুক বা কমুক, তাতে অবিলম্বে দল চাঙা হওয়া কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন করার সম্ভাবনা দেখছি না। কিন্তু বিএনপি সরকারকে ফেলে দেওয়ার আন্দোলন করতে না পারুক, জনগণের প্রাত্যহিক সমস্যা নিয়ে তো মাঠে থাকতে পারে। কিন্তু সেটি না করে তারা রুটিন প্রেস ব্রিফিং ও ইফতার অনুষ্ঠানের মধ্যেই দলের কার্যক্রম সীমিত রাখছে।
বিএনপি দেশের প্রধান দুটি দলের একটি। এখনো আওয়ামী লীগের নেতারা বক্তৃতা শুরু এবং শেষ করেন বিএনপিকে দিয়েই। অর্থাৎ মুখে স্বীকার করুক আর না-ই করুক, বিএনপিকেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে। সাড়ে তিন দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সেই বিএনপির কিছুতে না থাকার অর্থ হলো, আওয়ামী লীগ সবকিছুতে আছে। এ বিষয়ে আমরা একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি করতে পারি।
এক. বিএনপি সংসদে নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন তারা বর্জন করে। দুই. বিএনপি আন্দোলনে নেই। ২০১৫ সালের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির পর দলটি কোনো আন্দোলন গড়তে পারেনি বা গড়ার চেষ্টা করেনি। তিন. বিএনপির নেতৃত্ব দল গোছানোর কাজটিও করতে পারছে না। চার. বিএনপির নীতি ও কৌশল অস্পষ্ট ও স্ববিরোধী।
এবার দেখা যাক, আওয়ামী লীগ কোথায় কোথায় আছে। এক. তারা সংসদে আছে এবং সেই সংসদের সুবাদে ক্ষমতায়ও আছে। দুই. আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে ১৪ দলের বামপন্থী শরিকদের সঙ্গে আছে, আবার জাতীয় পার্টির মতো সেনাশাসকের তৈরি ডানপন্থী দলের সঙ্গেও আছে। আওয়ামী লীগ ১৪ দলের শরিকদের থেকে দুজন মন্ত্রী নিয়েছে, বিমুখ করেনি জাতীয় পার্টিকেও। তিন. আওয়ামী লীগের ঘোষিত নীতি ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম। একই সঙ্গে দলের সহযোগী বলে দাবিদার ওলামা লীগ ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা হিন্দুধর্মাবলম্বী প্রধান বিচারপতি ও ‘কমিউনিস্ট’ শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করতে যে হেফাজত মহাতাণ্ডব চালায়, সেই হেফাজতের সঙ্গে সরকারের আপসরফার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র যদি কেউ পরখ করে দেখেন, সেখানে আদর্শগত ফারাক নেই।
রাজনীতির মাঠ পেরিয়ে যদি আমরা অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে তাকাই, দেখব সর্বত্রই আওয়ামী লীগ। তারা ভালোতে আছে, মন্দতেও। গত সাত বছরে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে। সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশ বাংলাদেশ পূরণ করেছে। গত সাত বছরে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, বাজেটের আকার কয়েক গুণ বেড়েছে, স্ফীত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এসবের কৃতিত্ব নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ সরকার পেতে পারে।
একই সঙ্গে এই সাত বছরে আর্থিক খাতে যেসব কেলেঙ্কারি ঘটেছে, তার দায়টাও সরকারকে নিতে হবে। এই সাত বছরে হল-মার্ক কেলেঙ্কারি হয়েছে, বেসিক ব্যাংক লোপাট হয়েছে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে বারবার কোরামিন দিয়ে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বিএনপি-জামায়াতের লোক ছিলেন না। ছিলেন আওয়ামী লীগেরই ‘পরীক্ষিত’ নেতা-কর্মী। ছিলেন আওয়ামী লীগ যাঁদের যোগ্য মনে করেছে, সেসব আমলা, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ। এখন দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক রক্ষার চেয়ে তাঁরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তবে ব্যতিক্রমও আছেন।
গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোয় শওকত হোসেনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি যে ১০ বছরে (২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল) সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, ৯৬৬ দশমিক ৬০ কোটি টাকা। এর আগের দুই বছর ২০১১ ও ২০১২ সালে হয়েছে যথাক্রমে ৫৯২ দশমিক ১০ কোটি ও ৭২২ দশমিক ৫০ কোটি টাকা। বিএনপির আমলের তিন বছরে পাচার হয়েছিল প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। তাহলে পাচারের পাল্লাটা এ আমলেই ভারী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিএনপি আমলে বিদেশে পাচার হওয়া কিছু অর্থ ফেরত আনার কৃতিত্ব নিয়েছিল। কিন্তু তাদের আমলের পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কী হবে?
আওয়ামী লীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। দলীয় প্রধানকে কেন এত বছরের পুরোনো দলের ‘পরীক্ষিত’ নেতা-কর্মীদের সততার সবক দিতে হলো? নিশ্চয়ই তিনি তাঁদের সম্পর্কে এমন অভিযোগ পেয়েছেন, যার ভিত্তিতে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দেওয়া প্রয়োজন বোধ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই বিখ্যাত উক্তিও স্মরণ করতে পারি, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘চারদিকে সব চাটার দল। আমি বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে সাহায্য আনি, আর চাটার দল সব খেয়ে ফেলে।’ সেই সময়ের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের চেয়ে বর্তমানের ‘পরীক্ষিত’ নেতা-কর্মীরা বেশি সততা ও ত্যাগের পরিচয় দিচ্ছেন, এমন দাবি কেউ করবেন না। দলীয় প্রধান যখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি সততার সঙ্গে কাজ করতে বলেন, তখন তাঁর দলের কোনো কোনো সাংসদ ফেরারি আসামি, কেউ শিশুকে গুলি করে জেলে যান, কেউ সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর করে মামলার আসামি হন। নারায়ণগঞ্জের মতো অনেক এলাকায়ই সাংসদদের নাম শুনলে মানুষ শঙ্কিত বোধ করে।
দেশে সক্রিয় বিরোধী দল নেই। নাগরিক সমাজও জোর গলায় কিছু বলতে পারছে না। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বে একটি উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের যা করার সেটাই করছেন এবং ‘শতভাগ সততার’ সঙ্গে। প্রশাসন থেকে শিক্ষাঙ্গন, নদী থেকে মাঠ, পাহাড় থেকে হাওর—সবখানেই আওয়ামী লীগারেরা আছেন। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক, বিমা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের মালিকও তাঁরা। স্থানীয় জনপ্রশাসন–পুলিশ বিভাগও চলে তাদের অঙ্গুলি হেলনে। কিন্তু মাঝে মধ্যে পরিস্থিতি এতটা অসহনীয় হয়ে পড়ে যে জনপ্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করতে বাধ্য হন।
সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমরা কী দেখলাম? নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। মনোনীত বনাম বিদ্রোহী। হয় বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ মনোনীতকে মেরেছে, নয়তো মনোনীতকে বিদ্রোহী মেরেছে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী নির্বাচনী সংঘাতে নিহত ১১৬ জনের মধ্যে ৭১ জনই আওয়ামী লীগের। আর তাঁদের যাঁরা মেরেছেন, দু–একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরাও আওয়ামী লীগার।
সবখানেই যখন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার, তখন নিহতের তালিকায় পিছিয়ে থাকবে কেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

প্রথম আলো