সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

‌’রোগীর দুয়ারে ‘লন্ডনি হাসপাতাল’



e8e1555200401cc190bfd4b9aa288945-3

উজ্জল মেহেদী::

হাসপাতালের অভ্যর্থনাকক্ষে বসেছিলেন আফছানা খাতুন। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। বাঁ হাতের কনুই উঁচিয়ে একটি টিউমার দেখালেন। বললেন, ‘আমি আইছি না, আমারে তাঁরা বাড়ি থাকি খুঁজি আনছইন!’
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যতিক্রমই বটে। যেখানে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা পাওয়া দুরূহ, সেখানে হাসপাতালের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী খুঁজে আনছেন! তবে আফছানাই একমাত্র সৌভাগ্যবান নন; ওই অভ্যর্থনাকক্ষেই দুই নবজাতকের মাসহ মধ্যবয়স্ক আরও সাতজন নারীর দেখা মিলল। তাঁরা সবাই মাঠকর্মীদের মাধ্যমে এসেছেন হাসপাতালে।

হাসপাতালটির নাম বিয়ানীবাজার ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের দাসগ্রামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। উদ্যোক্তারা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী, যাঁরা সিলেট অঞ্চলে ‘লন্ডনি’ নামে পরিচিত। তাই হাসপাতালটিও লোকমুখে ‘লন্ডনি হাসপাতাল’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে।
বিয়ানীবাজারের মোল্লাপুর ইউনিয়নের লাসাইতলা গ্রামে গিয়ে দুবারের চেষ্টায় রক্ষণশীল আফছানা খাতুনকে হাসপাতালে আনতে সক্ষম হয়েছেন মাঠকর্মীরা। তাঁর কৃষক স্বামী মো. জামাল উদ্দিন একদিন গিয়ে হাসপাতাল দেখে এসে আশ্বস্ত হওয়ার পরই এটা সম্ভব হয়েছে। ওই এলাকায় ৪৩১ জন টিউমার-আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করেছেন হাসপাতালটির কর্মীরা। তাঁদের ৬০ ভাগই নারী।
দেশে স্বাস্থ্যসেবার সব কটি সূচকে পিছিয়ে আছে সিলেট অঞ্চল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বছরের মার্চ মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আট মাস ‘ডোর টু ডোর’ কার্যক্রম চালানো হয়। হাসপাতালের প্রশিক্ষিত ২০ জন মাঠকর্মীর সঙ্গে ২০ স্বেচ্ছাসেবী মিলে ৪০ জনের দল গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
এই মাঠকর্মীদের তদারক করেন হাসপাতালের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপক ফাতেমা-তুজ-জহুরা। তিনি জানান, তিন থেকে পাঁচ সদস্যের একেকটি দল সপ্তাহে তিন দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। পৌর এলাকাসহ বিয়ানীবাজারের আটটি ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী তিনটি উপজেলার ১৫ হাজার ৭৪৭টি বাড়িতে পৌঁছান মাঠকর্মীরা।
মাঠকর্মী ইমা বেগম জানান, সাধারণত ক্যানসারের সাতটি লক্ষণ নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলেন তাঁরা। একাধিক লক্ষণ পাওয়া গেলে হাসপাতালে এনে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হয়। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই প্রক্রিয়ায় ১১৯ জন ক্যানসার রোগী শনাক্ত করা গেছে। তাঁদের বয়স ৪৫ থেকে ৬৫-এর মধ্যে। এর মধ্যে নারী ৭১ জন, পুরুষ ৪৮ জন। নারীরা ব্রেস্ট ও জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত। পুরুষদের মুখে, গলায়, খাদ্যনালি, লিভার ও রক্তের ক্যানসার ধরা পড়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক সজিবুর রহমান জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই চিকিৎসাসেবার বাইরে ছিলেন। তাঁদের মাত্র ২৭ জন জানতেন, তাঁরা ক্যানসারে আক্রান্ত। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় কবিরাজি আর ঝাড়ফুঁক করিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন।
এর বাইরে ব্রেস্ট ও জরায়ুর ক্যানসার পরীক্ষার জন্য আরও ১ হাজার ৫২ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিনা মূল্যে করা হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালের উপদেষ্টা চিকিৎসক মহিউদ্দিন।

পার্শ্ববর্তী মৌলভীবাজারের বড়লেখা গ্রামের দৌলতপুরের ক্যানসারে আক্রান্ত নুরুন নাহারের (৬৫) ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়েছে। তিনিই প্রথম রোগী, যাঁকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয় এই হাসপাতালে। নুরুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে আছি, না লন্ডন আছি; বোঝবার দিছইন না তাঁরা (চিকিৎসক ও সেবিকারা)।’
বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়ে এটাই প্রথম কেমোথেরাপি দেওয়ার ঘটনা বলে জানালেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাদ উদ্দিন জায়গিরদার। তাঁর আশা, একদিন ক্যানসার রোগের সব ধরনের চিকিৎসা এখানে সম্ভব হবে।
কেমোথেরাপির জন্য হাসপাতালে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য হাসপাতালে কেমোথেরাপি দিতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে। অবস্থাসম্পন্ন রোগীরা নিজ থেকে ওষুধপত্র কেনেন। গরিব রোগীদের ওষুধ থেকে শুরু করে কেমোথেরাপির খরচ হাসপাতালের ‘দরিদ্র তহবিল’ থেকে দেওয়া হয়।
হাসপাতালের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা শাখায় প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগী দেখেন। এক বছরে এই শাখায় আট হাজার নিবন্ধিত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফি মাত্র ৬০ টাকা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বাজারমূল্যের চেয়ে ৪০ ভাগ কম রাখা হয় বলে দাবি করল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাজ্যের ২০১১ সালের আদমশুমারি বলছে, দেশটিতে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৫২৯ বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এই বাংলাদেশিদের ৯০ ভাগই সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা বলে জানায় প্রবাসীকল্যাণ সংগঠন বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার। এককভাবে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিয়ানীবাজারের। এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এই বিয়ানীবাজারেরই ২৬ জন উদ্যোগী প্রবাসী। প্রাথমিকভাবে তাঁরা চার মিলিয়ন পাউন্ডের একটি তহবিল গঠন করেন। উদ্যোক্তারা এক হাজার পাউন্ড অনুদান দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনায় অংশ নিতে আহ্বান জানালে এ পর্যন্ত ২২৯ জন প্রবাসী সাড়া দিয়েছেন। হাসপাতাল ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন খান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও এম সাব উদ্দিন।

স্থানীয় সাংসদ ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ২০১০ সালে ৬১ শতক জমির ওপর ৫০ শয্যার হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী প্রথম আলোকে বললেন, ‘উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হবে কি না, এ নিয়ে একধরনের দ্বিধা ছিল আমার মধ্যে। কিন্তু এখন আমি খুশি।’
বিয়ানীবাজার শহরের কলেজ রোড দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার এগোলে দাসগ্রাম। জনকোলাহলমুক্ত জায়গায় একটি চারতলা ভবন। সামনে খোলা প্রাঙ্গণ। একজন তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসকসহ ১২ জন চিকিৎসক রোগীদের সেবায় নিয়োজিত। ২০ জন মাঠকর্মীসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংখ্যা ৪০। স্থায়ী আবাসনের জন্য হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা হবে। একটিতে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকবেন। অপরতে রোগীর আত্মীয় বা দর্শনার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
সিলেটের সিভিল সার্জন মো. হাবিবুর রহমান হাসপাতালটি পরিদর্শন করে সার্বিক পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ক্যানসার তখনই ধরা পড়ে, যখন এ থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ থাকে না। কারণ, এই রোগের উপসর্গগুলো চিহ্নিত করে আগে থেকে মোকাবিলা করার বিষয়ে সচেতনতা কম। সেদিক থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করে এনে চিকিৎসা দেওয়া মহতী উদ্যোগ। সৌজন্যে: প্রথম আলো