শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

৬৮তম জন্মদিন আওয়ামী লীগের



photo-1466662918

ড. মো. হুমায়ূন কবীর::

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার ৬৭ বছর এবং তা ৬৮তম জন্মদিন। আমরা জানি, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামের একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু প্রগতিশীলরা সে উদ্ভট বিভক্তি মেনে নিতে পারেননি। তারই অংশ হিসেবে ১৯৪৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জুন পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের দ্বিতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে।

তখন সে দলের প্রথম সারির নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান পূর্ব বাংলার একাংশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। পরে এই সম্মেলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাশ লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেন হলরুমে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে একটি সম্মেলনে মিলিত হন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

শেরেবাংলা সে সম্মেলনে খানিক সময়ের জন্য উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। এ সম্মেলনেই পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। সেখানে সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। তখন শেখ মুজিব জেলখানায় থেকেই সেই দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৪০ সদস্যের এ অর্গানাইজিং কমিটিতে ২৯ বছর বয়সী শেখ মুজিব সেদিন তাঁর যোগ্যতাবলেই দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হতে পেরেছিলেন।

সেই কমিটির অন্যান্য কয়েকজন ছিলেন সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান, ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমদ এমএলএ, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, ২ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার মোশতাক আহমদ, সহসম্পাদক এ কে এম রফিকুল হোসেন, কোষাধ্যক্ষ ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রমুখ। পরে শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দলকে আস্তে আস্তে সংগঠিত করে ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনিই দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩ আসন লাভ করে। তার মধ্যে শরিক আওয়ামী লীগ একাই পায় ১৪৩ আসন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর দলের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে শেখ মুজিব পুরো সময় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আরেক নজির সৃষ্টি করলেন, যা রাজনীতিতে সচরাচর দেখা যায় না। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক হন এবং সে বছরই ছয় দফা ঘোষণা করা হয়।

১৯৬৮ সালের ৩ মে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়। এ সময় জেলে থেকেই শেখ মুজিব বাংলার মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হন। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে।

একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আসে আওয়ামী লীগের দখলে। এগুলো ছিল স্বাধীনতার পূর্বেকার আওয়ামী লীগের সাফল্যগাথা। তারপর আওয়ামী লীগের হাত ধরেই দেশের স্বাধীনতা। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এ দলটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, যার বলি হলেন এর প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু নিজেই। তবে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে আজো তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

আমরা জানি, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফাকে সঙ্গী করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রচিত হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার, মুক্তি ও স্বাধীনতা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের সব সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল একদল ঘাতকচক্র। তার আগে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, ছোট বোন শেখ রেহানাসহ, স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার উচ্চশিক্ষার্থে জার্মানিতে থাকার কারণে তাঁর সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করছিলেন। সে জন্য সেদিন তাঁরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়ে তখন তিনি জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করেও দেশে ফিরতে চাইলে তাঁকে তা করতে দেওয়া হয়নি। পিতামাতা, ভাইবোনসহ সব স্বজন হারানোর ব্যথা পাথর চেপে সেদিন তাঁকে বিদেশের মাটিতে থেকে যেতে হয়েছিল প্রায় ছয় বছর সময়। তখন অমানষিক কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়েছে তাদের। তার পরে যখনই তিনি দেশে ফিরতে চেয়েছেন, বারবারই দেশের সামরিক জান্তারা তাঁকে দেশে আসতে দেয়নি। অবশেষে তিনি নিজের দৃঢ় ও অনড় অবস্থানের কারণে, দেশি-বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৮১ সালের ১৭ মে তারিখে সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ আসে।

অতঃপর ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল হিসেবে দেশে গণতান্ত্রিক ধারার প্রবর্তন করতে পারলেও দেশ চলে যায় গভীর ষড়যন্ত্রের কশাঘাতে। উপর্যুপরি ভারতবিরোধী ও ধর্ম নিয়ে রাজনীতির গভীর এক ষড়যন্ত্রের অপপ্রচারে পড়ে যায় তাঁর দল। তার পরেও তার আন্দোলন থেমে থাকেনি এবং হাল ছাড়েননি তিনি। কিন্তু অবশেষে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এক অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আরোহণ করেন তিনি। সে মেয়াদে তিনি সংসদে কালো ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলপূর্বক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার শুরু করেন। ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, দীর্ঘদিনের অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, দেশের প্রথম ও দীর্ঘতম বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু উদ্বোধন, দেশকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাসহ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচিত করেছিলেন তখন তিনি। দেশকে পুরোপুরি ডিজিটালে রূপান্তরিত করেছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন, দেশকে আগামী মিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১ লক্ষ্যে পৌঁছাতে কাজ করে চলেছেন।

লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।