সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

হাওরে ভোটের উৎসব নেই



Kishoreganj-(Haor-Part-1)-Pসুনামগঞ্জের মানুষ বৈশাখে বোরো ঘরে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বছরের একমাত্র ফসল গোলায় তোলার আনন্দ এবার ভেসে গেছে টানা বৃষ্টি, ঝড় ও পাহাড়ি ঢলে। ফসল হারানোর বেদনায় এখানকার মানুষের কাছে ইউপি নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ কম। ফলে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা জেগেছে সবার মধ্যে।
সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার এই তিন উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোট গ্রহণ হবে আজ। এর মধ্যে ২২টি ইউনিয়নের মানুষই হাওরে উৎপাদিত বোরোর ওপর নির্ভরশীল।বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরেও ভোট নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে তিন উপজেলার অন্তত আটটি ইউনিয়নের মানুষের বোরো জমি আছে। গত বৃহস্পতিবার হাওরের উতারিয়া বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে ফসল তলিয়ে যায়। মানুষ এখন যা পারছে, তা-ই তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। শুধু দেখার হাওর নয়, গত নয় দিনে ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার অন্তত ১৮টি ছোট-বড় হাওরে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে।

তিন উপজেলার ২৬টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ১৫১ জন, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যপদে ১ হাজার ৪০৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে দেখার হাওরের পাড়ে কথা হয় আবদুল্লাপুর গ্রামের বাসিন্দা মজিবুর রহমানের সঙ্গে। অবসরপ্রাপ্ত এই সরকারি কর্মচারী বলেন, সুনামগঞ্জের মানুষের এক ফসলের ওপর নির্ভরশীলতা কারও অজানা নয়। তাহলেও ভোটটা বৈশাখ মাসে কেন? আগে কিংবা পরেও তো নির্বাচন করা যেত! বছরের এই সময়ে লোকজন বোরো ঘরে তোলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আগাম বৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি ও ঢল হাওরে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। তাই ভোট নিয়ে লোকজনের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই।
একই গ্রামের প্রবীণ হারুনুর রশিদ জানান, হাওরে চার উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বোরো জমি আছে। বেশির ভাগ ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। মানুষ কষ্ট করে যা পারছে, তা কাটার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় খুব কমসংখ্যক লোক ধান রেখে ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে তাঁর ধারণা।
মোল্লাপাড়ার জগজ্জীবনপুর গ্রামের ছায়াতুন নেছা (৩২) জানান, তিনি হাওরে দুই একর জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। কাটতে পেরেছেন মাত্র এক একরের মতো, তাও আধা পাকা। তাঁর মতো গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের বোরা ধান নষ্ট হয়েছে। তাঁদের মাথায় নির্বাচন নেই।
তবে ছায়াতুন নেছার পাশে থাকা সবিতা রানি দে (৪৫) বলেন, গ্রামের লোকজন ভোটে প্রার্থী হয়েছেন। কষ্ট হলেও যেতে হবে।
কথা হয় মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও এবারের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. নুরুল হকের সঙ্গে। তিনিও ভোটারদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বৈরী আবহাওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে ভোটারদের উপস্থিতি কম হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাঁর মতে, চৈত্র অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসে ভোট হলে ভালো হতো।
এখানকার আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস সোবহান অবশ্য মনে করেন, হাওরের ফসলহানিতে সবারই ক্ষতি হয়েছে। সবারই মন খারাপ। এরপরও লোকজন ভোটকেন্দ্রে যাবেন।
অবশ্য ভিন্নমতও আছে। যেমন বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আজমল হোসেন বলেন, সদস্যপদে ছয়-সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা সবাই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও বন্ধুদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হবেন। কাজেই ভোটারের উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ নেই।
বাওন হাওর তলিয়ে গেছে গত বুধবার। ফলে সদর উপজেলার কুরবানগর ইউনিয়নের লোকজন এবার ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। স্থানীয় বাসিন্দা নুর মিয়ার (৬৫) বলেন, হাওরের ফসল ঘরে তুলতে না পেরে যখন মন ভেঙে যায়, তখন আবার কিসের ভোট, কিসের উৎসব!
সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৮টি হাওরে এবার ২ লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষক-জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, এটা সত্য সুনামগঞ্জে হাওরের ফসলের ওপরই বেশির ভাগ মানুষ নির্ভরশীল। এবার অসময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও শিলাবৃষ্টিতে হাওরের ফসলহানি লোকজনকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় ভোটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময় ঘনিয়ে আসায় সেটি আর হয়নি। যেহেতু  আজ  ভোট হচ্ছে, তাই আমরা সবাইকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে অনুরোধ করব।’