মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ধান কেটেও বিপদে কৃষক, প্রতি মণ ধান পাঁচ শ’ টাকা



1430118549পেটের তাগিদে ডুবে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তুলেও বিপদে পড়েছে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। ধান চাষাবাদ এবং কেটে আনাসহ (অঞ্চলভেদে) একরপ্রতি ১১ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হলেও বেশিরভাগ এলাকায় এখন এক একর জমির ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। ধানের ব্যাপারি, ফরিয়ারা ধান কিনছে না। অবস্থা এমন হয়েছে যে,‘ফেলে দাওতো আমাকে দাও’।
সুনামগঞ্জের ১৩৮ টি হাওরে এবার ২ লাখ একুশ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চালে ৮ লাখ ৩৫ হাজার মে.টন। টাকার অংকে এই চালের মূল্য দুই হাজার আট’শ কোটি টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক জাহেদুল হক জানান, অকালে হাওরে পানি আসা ও শিলাবৃষ্টিতে এবার ৩৭ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। যার মূল্য ৫০ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগের এই হিসাবকে অবশ্য জেলার ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলসহ হাওরাঞ্চলের একাধিক কৃষক নেতা ও জনপ্রতিনিধি ‘মনগড়া-ভিত্তিহীন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বেশী’ বলেছেন। কৃষক নেতারা বলেছেন,‘দরদে ধান কেটেও বিপদে পড়েছেন সকল কৃষক। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই হাওর ডুবে যাওয়া শুরু হয়েছে এবং বেশির ভাগ হাওর থেকেই তাড়াহুড়ো করে কৃষকরা যে ধান কেটেছেন, তা আধা কাঁচা বা অপুষ্ট ধান, এই ধান এখন কৃষকরা বিক্রি করতে পারছেন না, ধানের ব্যাপারি ও ফরিয়ারা এমন ভাব দেখাচ্ছে যে ‘ফেলে দাওতে আমাকে দাও’।
ধর্মপাশার কৃষক নেতা কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন,‘এক একর জমি চাষাবাদ করতে সেচের জন্য খরচ হয় কমপক্ষে ৭০০০ টাকা, মজুরি বাবদ লাগে ৩৫০০ টাকা, সার ও বীজ লাগবে কমপক্ষে ৩০০০ টাকার অর্থাৎ উৎপাদন খরচ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।
এবার চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাওরে পানি প্রবেশ শুরু হওয়ায় ৬’শ থেকে ৭’শ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটতে দিতে হয়েছে। তাতে প্রতি একর জমির ধান কাটতে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এরপর এই কাটা ধান হাওরের জমি থেকে খলায় (ধান মাড়াই স্থল) আনতে একর প্রতি দুই হাজার পাঁচ’শ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। পরে ধানের মাড়াই বাবদ খরচ হয়েছে আরো প্রায় ২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবার একর প্রতি খরচ হয়েছে ২৭ থেকে সাড়ে ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতি একর জমিতে ধান উৎপাদন হয় ৬০ মণ। আধা কাঁচা ধান কাটায় ধান পাওয়া গেছে ৩০ মন। এখন এই ধান বেশি দিন রাখার কোন সুযোগও নেই, বেশি দিন রাখলে ধান সাদা হয়ে যাবে, চিটা হয়ে যাবে। এই অবস্থায় ধানের ব্যাপারি ও ফরিয়ারা সুযোগ পেয়েছে ,তারা প্রতি মণ ধান সাড়ে ৩’শ থেকে ৪’শ টাকার বেশি কিনছে না এবং কৃষকরা বাধ্য হয়ে সেই দামেই বিক্রি করছে। তাতে এক একর জমির ধানের উৎপাদন খরচ সব মিলিয়ে সাড়ে ২৭ হাজার টাকা হলেও উৎপাদিত ৩০ মণ ধান বিক্রি করে পাচ্ছে সাড়ে দশ থেকে ১২ হাজার টাকা। সরকার ধানের মূল্য ৯২০ টাকা মণ করলেও প্রান্তিক কৃষকরা সেখানে ধান দিতে পারে না, ধান সাধারণত দিয়ে থাকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্টরা। এছাড়া এখনো সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান কেনা শুরুও হয়নি। এই অবস্থায় দরদের কারণে জমি থেকে ধান কেটে এনেও বিপদে পড়েছে কৃষকরা’।
জামালগঞ্জের কৃষক নেতা ও ইউপি সদস্য রবীন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন,‘প্রতি কেয়ার জমির ধান কাটতে এবার আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আধা কাঁচা ধানই বেশি কাটা হয়েছে। আবার ধান শুকানোও যায়নি। এই অবস্থায় ধান কেটেও বিপদে পড়েছি আমরা’।
জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন,‘আমার নিজের ১০০ মন ধান ৫২০ টাকা দরে আগাম বিক্রি করেছিলাম, ধান কাটার পর ধানের ব্যাপারি বলছে ৪০০ টাকা মণের বেশি সে ধান নেবে না। পরে এই দামেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে’।
জেলার শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতা অবনী মোহন দাস বলেন,‘এবার ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যায়নি, শ্রমিকরা আসার আগেই ধান তলিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় স্থানীয় ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গা চাষীরা নিজের ধান কেটেছে, এমনকি প্রায় সকল প্রান্তিক কৃষক পরিবারের নারী সদস্যরা এবার নিজের ধান কেটেছে এবং অন্যের ধানও বেশি টাকা মজুরি নিয়ে কেটেছে’। তিনি জানান, কাঁচা ধান যারা কেটেছে, তারা এখনই ধান বিক্রি করতে হবে, না হয় এসব ধান খুতিপোকায় নষ্ট করে দেবে।
সদর উপজেলার সৈয়দপুরের ধানের ব্যাপারী নাদীর শাহ্ বললেন,‘এবার সকল কৃষকের ধান কিনছি না আমরা, বেশিরভাগ কৃষকের ধান বাত্তি (পুষ্ট) নয়। কাঁচা- ভিজা ধান কাইট্টা তুলছে কৃষকরা, এমনও ধান আছে এক মন ধানে ১০-১২ কেজি চাউল (চাল) হবে, চাউলের গুণগত মান ভাল হবে না, এজন্য বুঝে শুনে ধান কিনছি’।