সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ট্যাক্সের বিনিময়ে গ্রাম পাহারা, চোরদের পেশা বদল !



shallaশাল্লার চোরদের প্রধান পেশা এখন পাহাড়াদারের নামে ‘ট্যাক্স’ আদায় করা। গত ৬-৭ বছর ধরে এলাকায় তারা এমন ‘ট্যাক্স’ আদায় করছে। শাল্লা, কিশোরগঞ্জের ইটনা, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি এবং আজমিরিগঞ্জের অত্যন্ত ৫০ টি গ্রাম থেকে এরা ‘ট্যাক্স আদায় করে। প্রভাবশালী একেক জন চোর ৩-৪ টি গ্রাম থেকে এবং কম প্রভাবশালী চোরেরা জনে ১-২ টি গ্রাম থেকে ‘ট্যাক্স’ আদায় করে। ট্যাক্সের বিনিময়ে তারা ওইসব গ্রামকে চুরির উৎপাত থেকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা দেয়।

শাল্লার একাধিক সমাজ সচেতন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার কামারগাঁওয়ে ৪০ পরিবার, চিকাডুবিতে ১০ পরিবার, বল্লবপুরে ১০ পরিবার, উজানগাঁওয়ে ১০ পরিবার এবং নারকিলায় এখনো ৩০ পরিবারের পেশা চুরি। কিন্তু এলাকায় এরা চুরি কমিয়ে দিয়েছে। এলাকায় মূলত. এরা এখন গ্রাম পাহাড়া দেবার বা দেখভাল করার দায়িত্ব নেয় এবং বছর শেষে চুক্তি অনুযায়ী ধান নেয়।
এক সময় শাল্লার চোরদের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল শাল্লা উপজেলা, কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ধনপুর ও মৃগা ইউনিয়ন, খালিজুরির নগর ইউনিয়ন ও আজমিরিগঞ্জের বদরপুর ইউনিয়ন।
শাল্লার ৪ টি ইউনিয়ন এবং কিশোরগঞ্জের ধনপুর, মৃগা, নগর এবং বদরপুরও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। ব্রিটিশ আমল থেকেই এসব এলাকার মানুষ চোরের যন্ত্রণায় অতিষ্ট ছিলেন। ৭ বছর আগে এলাকাবাসী চোরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে এবং প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়ায় এলাকায় গত ৬ বছর ধরে চুরি কমেছে, কিন্তুু চোরেরা পেশা বদলায়নি। তবে চুরির ধরন বদলে দিয়েছে তারা। এলাকার গ্রামগুলোতে পাহাড়া দেবার অজুহাতে ‘ট্যাক্স’ আদায় করে এরা।
প্রভাবশালী চোরেরা একজনে ৩-৪ টি গ্রাম, আবার অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালীরা জনে ১ টি বা ২ টি গ্রাম পাহাড়া দেবার দায়িত্ব নেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে (বড় গ্রাম হলে) ২ জন চোর মিলে এক গ্রাম পাহাড়া দেবার দায়িত্বে রয়েছে। বিনিময়ে তাঁদেরকে বছরে এক থেকে দেড়’শ মন ধান দিতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার শাল্লার কামারগাঁওয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে খুন হওয়া চোর জলিল মিয়া খালিয়াজুরির হায়াতপুর গ্রামের কথিত পাহাড়াদার ছিল। এই ইউনিয়নের কোশালপুরের দায়িত্বে কামারগাঁওয়ের চোর মনির মিয়া এবং চাঁনপুর গ্রামের দায়িত্বে একই গ্রামের চোর নিয়ামত মিয়া। আজমিরিগঞ্জের বদরপুর ইউনিয়নের কোটালি গ্রামের দায়িত্বে কামারগাঁওয়ের চোর নূর আলী মিয়া, শাল্লার বাহাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুরের দায়িত্বে একই গ্রামের চোর শামছু মিয়া।
এই ক’জন শুধু নয় শাল্লার ৪ ইউনিয়ন, ইটনা উপজেলার নগর ও মৃধা, খালিয়াজুরি উপজেলার নগর এবং আজমিরিগঞ্জের বদরপুর ইউনিয়নের কমপক্ষে ৫০ টি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম থেকেই শাল্লার ৫ গ্রামের চোরেরা কথিত পাহাড়ার নামে ‘ট্যাক্স’ আদায় করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো পাহাড়াদারদের বাস্তবে কোন গ্রামেই পাহাড়া দিতে হয় না, তারা এইসব গ্রামে মাঝে মধ্যে কেবল রাত্রি যাপন করে। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে আসে। এসব গ্রামের মানুষ অনেক সময়, তাদের গ্রামকে চোর পাহাড়া দেয় বলে অন্যদের জানায় না, কোন কোন ক্ষেত্রে বিষয়টি গোপন রাখার শর্তও দেয় চোরেরা।
শাল্লা উপজেলার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস চোরদের গ্রাম পাহাড়া দেবার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘১৫-২০ জন চোর আমি জানি, বছরব্যাপি গ্রাম পাহাড়া দেয়। এই পাহাড়া দেবার বিষয়টি অবশ্য অনেক গ্রামের লোকজন গোপন রাখার চেষ্টা করেন’।
অবনী মোহন জানান, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের চেষ্টায় শাল্লায় চুরি কমেছে। পেশাদার চোররা এলাকায় থাকে না, কেউ কেউ পাহাড়া দেবার দায়িত্বে রয়েছে, কেউ বা শহরে গিয়ে অন্য কাজ করে’।
শাল্লা থানার ওসি বজলার রহমান অবশ্য বলেছেন,‘ব্রিটিশ আমল থেকেই এরা চোর, দাদা ছিল চোর, এখন নাতি চুরি করে, গ্রাম পাহাড়া দেবার দায়িত্বে কয়েক বছর আগেও অনেক চোর ছিল, এখন এটি কমে গেছে, গ্রামবাসী চোরদের এভাবে ট্যাক্স দিতেও রাজি নয়’।