সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

সরকারি জমি দখলের মহোৎসব- অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ-বিএনপি



Untitled-1সুমেশ্বরী (উব্দাখালী) নদীর তীরে হাওরের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগরবাজারের উত্তর পাশে সরকারি মূল্যবান জমি দখলের হিড়িক পড়েছে বলে জানা গেছে। মধ্যনগর থানার বিপরীত দিকে নির্মাণাধিন ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের আশপাশের সরকারি জমি দখল করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী অঙ্গ সংগঠন ও বিএনপির নেতাকর্মীরা।

বাশেঁর বেড়া দিয়ে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে দখলকৃত জমিতে মাটিভরাট করা হচ্ছে। তবে দখল ঠেকাতে কেউ বাধা নিষেধ দিচ্ছে না। এছাড়া দখলদাররা দুই রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মী হওয়ায় দখল অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস থেকে দখল ঠেকাতে কোন উদ্যোগ নেই ।

মধ্যনগর বাজার এলাকার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, মধ্যনগর মৌজার ৯ নং জেল এল এর- ১ নং খাস খতিয়ানের অন্তর্ভূক্ত বাজারের পাশের জমি ভরাট করা হচ্ছে অনেক দিন ধরে।

এলাকাবাসী জানান, নির্মাণাধিন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের আশপাশের সরকারি মূল্যবান ভূমি বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রথমে দখল করা হয়েছে। এখন পুরোদমে চলছে মাটি ভরাটের কাজ।

কোটি কোটি টাকা মূল্যের সরকারি এই জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে মধ্যনগর থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক মোবারক হোসেন, মধ্যনগর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম মজনু, মধ্যনগর থানা যুবলীগের আহবায়ক মোস্তাক আহমদ, ধর্মপাশা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন রোকন, ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অমরেশ চৌধুরী, ছাত্রলীগ নেতা রনি, পারভেজসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংশিষ্ট নেতৃবৃন্দ।

নির্মাণাধিন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের পাশের চা স্টলের দোকনদার গোপাল সরকার বলেন,‘সরকারি জমি কৌশলে দখল করে বাজারে ভিট করা হচ্ছে। কে কাকে বাধা দিবে, যারা দখল করছেন তারাই সরকারে রয়েছেন। দখলদার সবাই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কোন বাধা নিষেধ কাজে আসে না।’

বাজারের পল্লী চিকিৎসক (আর্মি ডাক্তর) অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মো. আনিসুল ইসলাম বলেন,‘এইসব জায়গা যাদের নামে বন্দোবস্ত নেয়া হয়েছে তারা কেউ দখলে নেই। প্রভাবশালীরা দখল নিয়ে মাটি ভরাট করে এখানে একবছর আগ থেকেই ঘর নির্মাণ শুরু করেছে। যারা আগে শুরু করেছেন তাদের ঘর তৈরির কাজ শেষ। এখন নতুন করে আবার দখল ও মাটি ভরাটের কাজ চলছে। দখলের সাথে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতৃস্থানীয়রাই জড়িত। যারা আগে দখল করেছেন তারা এখনও করছেন। সরকারি মূল্যবান এই জমি নেতারা ১০-২০ হাত করে বণ্টন করে নিয়েছেন।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নিরঞ্জন তালুকদার খোকা বলেন,‘মধ্যনগর উপজেলা কমপেক্স করার জন্য এরশাদ আমলে ৮ একর ৪০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই জায়গা এখন ৩-৪ জন ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত আনা হয়েছে। পরে তাদের কাছ থেকে দখল কিনে কৌশলে জমি ভরাট করে ভিট তৈরি করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই কাজটি করছেন। যেভাবে দখল করা শুরু হয়েছে ভবিষ্যতে জমির অভাবে মধ্যনগরে আর উপজেলা হবে না।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম আহমদ বলেন,‘আমরা শুনেছি এই সরকারি জমি নাকি দুলাল নামের একজন বন্দোবস্ত নিয়েছেন। পরে তিনি অন্যদের কাছে দখল বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা দখল করে বাঁেশর বেড়া দিয়ে মাটি ভরাট করছেন।’ তিনি সরকারি প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন,‘মধ্যনগরে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেক আন্দোলন, সভা সমাবেশ করেছি। যদি কোন দিন উপজেলা অনুমোদন হয় তাহলে তখন উপজেলার প্রশাসনিক দপ্তর করার মত কোন জমি থাকবে না। আমাদের জোর দাবি যত দ্রুত সম্ভব এই জমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হোক।’

মধ্যনগর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক আহবায়ক গিয়াস উদ্দিন নূরী বলেন,‘অনেক মানুষের মত আমিও শুনেছি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতকর্মীরাই সরকারি এই জমিতে মাটি ভরাট করছেন। ’
অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন বলেন,‘ আমি এসব জমি ভরাটের সাথে জড়িত নই। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা প্রতিহিংসায় এসব অভিযোগ করে। আবুল কাশেম এই জমি ১৫-১৬ বছর আগে বন্দোবস্ত নিয়েছে, সে নিজেই ওই জমিতে মাটি ভরাট করছে। ’
মধ্যনগর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম মজনু বলেন,‘ আমি সরকারি কোন জমি দখল কিংবা ভরাট করিনি। আমার নামে এই জমির দলিল বা বন্দোবস্ত নেই। যারা আমার বিরুদ্ধে এসব কথা বলছে তারা মিথ্যা বলছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে এই জমির দখলে ছিলেন তারা বন্দোবস্ত নিয়েছেন, এখন তারাই মাটি ভরাট করছেন। অন্য কেউ বা কোন নেতাকর্মী সরকারি জমি দখল বা ভরাট করেনি। ’
এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা অমরেশ চৌধুরী ও মধ্যনগর থানা যুবলীগের আহবায়ক মোস্তাক আহমদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন রোকনকে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বলেন,‘ আমার কাছে এধরনের অভিযোগ এসেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি এই জমি এক সময় সরকারি জমি ছিল। অনেক আগে কিছু লোক বন্দোবস্ত নিয়েছেন। তারাই মাটি ভরাট করছে, হয়ত তারা কারো কাছে দখল হস্তান্তর করতে পারেন। আমার বিরুদ্ধে এই জমি দখল বা মাটি ভরাট করার অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে কত কথাই না বলে। সরকারি জমি দখল বা মাটি ভরাট করার এসব অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রনোদিত।’

মধ্যনগর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন উপ সহকারি কর্মকর্তা (তহশীলদার) জামাল হোসেন বলেন,‘মধ্যনগর বাজার এলাকার থানার বিপরীতে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের আশপাশের সরকারি খাস জমি ২০০০ সালের আগে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল। ৪-৫ দিন আগে আমরা পুলিশ নিয়ে বাঁশের বেড়া উচ্ছেদ করেছি। এর পর আবার কেউ এখানে বেড়া দিয়েছে বা মাটি ভরাট করছে বলে আমাদের জানা নেই। এসব বন্দোবস্ত বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন বাতিল করা হবে কিনা এটা উপজেলা ও জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিবেন।’

ধর্মপাশা উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হক বলেন, ‘গত সপ্তাহে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে পুলিশের সহায়তায় অবৈধ দখলদারদের বাঁশের বেড়া উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে এই জমির সার্বিক অবস্থার রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। পরে আর কেউ অবৈধভাবে দখল করেছে কি না জানা নেই। মধ্যনগর বাজার এলাকার সরকারি জমির বন্দোবস্ত বাতিলের কোন প্রস্তাব আমার নজরে আসেনি। খোঁজ খবর নিয়ে দেখা হবে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘জনস্বার্থে প্রয়োজনে মধ্যনগরবাজার এলাকার এই ভূমি বন্দোবস্ত বাতিলের প্রস্তাব ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে আসলে গুরুত্ব সহকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই সরকারি জমির সার্বিক অবস্থা জানতে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলব।’