শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

পরিবেশ রক্ষায় ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ এর ভূমিকা



roni5

রিচার্ড দত্ত:

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় এক লাখ ২৬ হাজার ৫১০টি ইটভাটা আছে। বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়ার কথা। কারন অলি গলিতে যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো ইটভাটা গজিয়ে উঠেছে তাতে অনুমানটা অবান্তর নয়। ঘর বাড়ি তৈরিতে ইটের কুনো বিকল্প নাই। তাই ইটভাটার প্রয়োজনটা অনস্বীকার্য, কিন্তু যেখানে সেখানে গজিয়ে ওঠা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এটি পরিবেশের ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২০১৩ সালে সরকার পূর্ববর্তী সকল আইনের উপর প্রাধান্য রেখে নুতুন আইন তৈরি করে যা ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ নামে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এই আইনের ধারা ৩ এ উক্ত আইনের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় যেখানে বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলি কার্যকর থাকিবে। আজকে আমরা দেখবো আইনে ইট ভাটা তৈরিও ব্যবস্থাপনায় আইনে কি কি নির্দেশনা রয়েছে যা আমাদের ইট ভাটার কার্যাবলী পর্যবেক্ষণে সাহায্য করবে এবং আইন লঙ্ঘনে আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।

১। লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধঃ বালি ও সিমেন্ট দ্বারা তৈরী কোন ইট ছাড়া, অন্য যেকোনো ইট তৈরির ক্ষেত্রে ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারিবেন না। অন্যথায় তিনি অনধিক ১(এক) বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

২। মাটির অপব্যবহার রোধঃ উক্ত আইনের ধারা ৫(১) মতে, কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হইতে মাটি কাটিয়া বা সংগ্রহ করিয়া ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।

আবার, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত, কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করিবার উদ্দেশ্যে মজা পুকুর বা খাল বা বিল বা খাঁড়ি বা দিঘি বা নদ-নদী বা হাওর-বাওর বা চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা হইতে মাটি কাটিতে বা সংগ্রহ করিতে পারিবে না। অন্যথায় তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ (দুই) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করিয়া কোন ব্যক্তি ভারি যানবাহন দ্বারা ইট বা ইটের কাঁচামাল পরিবহন করিতে পারিবেন না। করিলে তিনি অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

৩। জ্বালানী কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধঃ কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসাবে কোন জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করিতে পারিবেন না। অন্যথায় তিনি, তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

৪। কয়লার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণঃ কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে নির্ধারিত মানমাত্রার অতিরিক্ত সালফার, অ্যাশ, মারকারি বা অনুরূপ উপাদান সম্বলিত কয়লা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করিতে পারিবেন না। অন্যথায় তিনি তিনি অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

৫। কতিপয় স্থানে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধকরণ ও নিয়ন্ত্রণঃ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ৮ ধারা মতে- (১)আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ছাড়পত্র থাকুক বা না থাকুক, এই আইন কার্যকর হইবার পর নিম্নবর্ণিত এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে কোন ব্যক্তি কোন ইটভাটা স্থাপন করিতে পারিবেন না, যথাঃ-

(ক) আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যেক এলাকা;

(খ) সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর;

(গ) সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি;

(ঘ) কৃষি জমি;

(ঙ) প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা;

(চ) ডিগ্রেডেড এয়ার শেড (Degraded Air Shed)।

এই নিয়মের ব্যতিক্রম হলে, তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(২) এই আইন কার্যকর হইবার পর, নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার অভ্যন্তরে ইটভাটা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কোন আইনের অধীন কোনরূপ অনুমতি বা ছাড়পত্র বা লাইসেন্স, যে নামেই অভিহিত হউক, প্রদান করিতে পারিবে না।

(৩) পরিবেশ অধিদপ্তর হইতে ছাড়পত্র গ্রহণকারী কোন ব্যক্তি নিম্নবর্ণিত দূরত্বে বা স্থানে ইটভাটা স্থাপন করিতে পারিবেন না, যথাঃ—

(ক) নিষিদ্ধ এলাকার সীমারেখা হইতে ন্যূনতম ১ (এক) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে;

(খ) বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অনুমতি ব্যতীত, সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা হইতে ২ (দুই) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে;

(গ) কোন পাহাড় বা টিলার উপরিভাগে বা ঢালে বা তৎসংলগ্ন সমতলে কোন ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে উক্ত পাহাড় বা টিলার পাদদেশ হইতে কমপক্ষে ১/২(অর্ধ) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে;

(ঘ) পার্বত্য জেলায় ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে, পার্বত্য জেলার পরিবেশ উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে;

(ঙ) বিশেষ কোন স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বা অনুরূপ কোন স্থান বা প্রতিষ্ঠান হইতে কমপক্ষে ১ (এক) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে; এবং

(চ) স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত উপজেলা বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক হইতে কমপক্ষে ১/২ (অর্ধ) কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে।

উপরুক্ত নিয়ম ভঙ্গ করলে, তিনি অনধিক ১ (এক) বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৪) এই ধারা কার্যকর হইবার পূর্বে, ছাড়পত্র গ্রহণকারী কোন ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ এলাকার সীমানার মধ্যে বা উপ-ধারা (৩) এ উল্লিখিত দূরত্বের মধ্যে বা স্থানে ইটভাটা স্থাপন করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি, এই আইন কার্যকর হইবার ২ (দুই) বৎসর সময়সীমার মধ্যে, উক্ত ইটভাটা, এই আইনের বিধানাবলি অনুসারে, যথাস্থানে স্থানান্তর করিবেন, অন্যথায় তাহার লাইসেন্স বাতিল হইয়া যাইবে।

ব্যাখ্যাঃ এই ধারায়,-

(ক) “আবাসিক এলাকা” অর্থ এমন কোন এলাকা যেখানে কমপক্ষে ৫০ (পঞ্চাশ) টি পরিবার বসবাস করে;

(খ) “জলাভূমি” অর্থ কোন ভূমি যাহা বৎসরের ৬ (ছয়) মাস বা তদূর্ধ্ব সময় পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে এবং যাহা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষিত;

(গ) “প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা” অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা ৫ এর অধীন ঘোষিত কোন এলাকা;

(ঘ) “বাগান” অর্থ এমন কোন স্থান যেখানে হেক্টর প্রতি কমপক্ষে ১০০ (একশত) টি ফলদ বা বনজ বা উভয় প্রকারের বৃক্ষ রহিয়াছে, এবং চা বাগানও উহার অন্তর্ভুক্ত হইবে; এবং

(ঙ) “ব্যক্তিমালিকানাধীন বন” অর্থ এমন কোন বন যাহা বন অধিদপ্তর কর্তৃক ব্যক্তি মালিকানাধীন বন হিসাবে স্বীকৃত এবং যাহার গাছপালার আচ্ছাদন (crown cover) বনের কমপক্ষে ৩০ (ত্রিশ) ভাগ এলাকায় বিস্তৃত থাকে, এবং সামাজিক বন বা গ্রামীণ বনও উহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।

উল্লেখ্য, এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে, এই আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ দায়ের, আমলে গ্রহণ, সমন বা ওয়ারেন্ট ইস্যুকরণ, জামিন প্রদান তদন্ত, বিচার, দণ্ডারোপ, বাজেয়াপ্তি, আপীল, ইত্যাদি বিষয়ে মোবাইল কোর্ট আইন, পরিবেশ আদালত আইন, বা ক্ষেত্রমত, ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানাবলি প্রযোজ্য হইবে।

লেখকঃ মাস্টার্স(অধ্যয়নরত), আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইলঃ richard.datta@yahoo.com

রেফারেন্সঃ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩