শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

মূলধনের ঘাটতি নেই, তার পরও বড় শিল্পকারখানার নেই !



sylheti_nasir_201766996850ddd1eded23c2.29199349.jpg_xlargeপ্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় সিলেটের অনেক মানুষেরই মূলধনের ঘাটতি নেই। গ্যাস-বিদ্যুৎ আছে। জমি দুষ্প্রাপ্য নয়। ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাটাও ভালো। ব্যাংকগুলোও টাকা নিয়ে বসে আছে। পাশেই ভারতের সাত রাজ্যের বড় বাজার আছে। এত সব সম্ভাবনা থাকার পরও কেন বড় কোনো শিল্প হচ্ছে না? এমন প্রশ্নে সিলেটের ব্যবসায়ী নেতাদের কেউ কেউ বলেন, ট্রেডিং বা দোকানদারির ব্যবসা করতেই বেশি আগ্রহ বোধ করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। বড় শিল্পকারখানার ঐতিহ্য নেই। বড় প্রকল্পের ঝুঁকি নিতে অনীহাসহ অভিজ্ঞতার ঘাটতি তো আছেই। কিছু ভিন্ন যুক্তিও আছে।

বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) ২০০০ সালে সিলেটে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তারপর গত ১৬ বছরে সিলেট বিভাগে সাতটি খাতের মোট ৬৬টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠানটি থেকে নিবন্ধন নেয়। এর মধ্যে শুধু সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় আছে ৫০টি। এসব শিল্পকারখানায়
বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩০৯ কোটি টাকা। এর বাইরে বিসিকের অনুমোদন নিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। তবে পুরো জেলায় বড় বা ভারী কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের তথ্য মেলেনি।

কুটির শিল্প স্থাপনেও সিলেট অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১১ সালে সারা দেশের কুটির শিল্প নিয়ে একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, সিলেট বিভাগে ২৭ হাজার ৭৯১ ইউনিট কুটির শিল্প আছে, যা সারা দেশের ৮ লাখ ৩০ হাজার কুটির শিল্পের মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্য সব বিভাগের চেয়ে এটি কম। সর্বোচ্চ ঢাকায়, প্রায় ৩০ শতাংশ।

শিল্প স্থাপনের এসব চিত্রের বিপরীতে গত ১৬ বছরে সিলেট শহরে দোকানপাটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। উপশহরের শাহজালাল তৃতীয় সেতু হয়ে কদমতলী দিয়ে কিন ব্রিজ পাড়ি দিয়ে বন্দরবাজারে গেলেই হাজার হাজার দোকানপাট চোখে পড়বে। ২০০০ সালে ২০-২২ হাজার দোকানপাট ছিল। এখন নিবন্ধিত দোকানের সংখ্যা ৬০ হাজার। এমন তথ্যই দিলেন সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব। তবে করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানালেন, সংখ্যাটি ৮০-৯০ হাজার হবে। কারণ সব প্রতিষ্ঠান করপোরেশনের নিবন্ধন নেয়নি।

দুই দিন ধরে ১৭ জন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁরা জানালেন, সিলেটে অন্য জেলার ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। কারণ প্রবাসী আত্মীয়স্বজন থাকায় সিলেটের অনেকেই অন্য এলাকার তুলনায় একটু আয়েশি জীবন যাপন করেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে তাঁদের আগ্রহ একটু কমই। বেলা ১১টার আগে শহরের পথঘাট অনেকটা ফাঁকাই থাকে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি জুনুন মাহমুদ খান বললেন, আশি ও নব্বইয়ের দশকে যখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে, তখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তা ছাড়া সিলেটে শ্রমিক পাওয়া যেত না। তাই এখানকার অনেকেই ঢাকার আশপাশে কারখানা করলেও নিজের শহর সিলেটে করেননি।

বিনিয়োগ বোর্ডের উপপরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন, সিলেটে মূলধন ও অবকাঠামো আছে। তবে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে না। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে এখানকার মানুষ ব্যবসায়ী নন। যাঁরা ছোটখাটো কিছু করেন, তাঁরাও ভালোভাবে বিপণন করতে পারেন না। তিনি বলেন, প্রবাসীরা সিলেট অঞ্চলের বড় শক্তি। কিন্তু তাঁদের অনেকেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি তৈরি করলেও শিল্প স্থাপনে আগ্রহ দেখান না।

নাম প্রকাশ করা হবে না এই শর্তে বেসরকারি একটি ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক বললেন, ‘আমরা টাকা নিয়ে বসে আছি। কিন্তু কেউ যদি বড় প্রকল্প না নিয়ে আসেন, তবে আমরা কী করতে পারি? তবে দু-তিন কোটি টাকার মতো ছোট বিনিয়োগ এখানে হচ্ছে।’

ইসলামী ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) সারওয়ার ইসলাম জানালেন, শুধু সিলেটের তালতলা শাখার মাধ্যমেই গত বছর ১৭৫ কোটি টাকা প্রবাসী-আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। এসব টাকা প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণেই খরচ হয়। তিনি জানালেন, সিলেটের ব্যবসায়ীরা মূলত দোকানপাট, পাথর ও কয়লা আমদানি, ধান ও সুপারি ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন।

প্রবাসীদের বিনিয়োগের বিষয়ে জুনুন মাহমুদ বলেন, ‘প্রতিবার দেশে আসার সময় বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। আপনি তাঁদের বিনিয়োগে আনতে চান, তার মানে হলো তাঁর পকেটের টাকা চান। তাহলে আগে প্রবাসীদের যোগ্য সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে হবে। এই কাজগুলো করার আগে তাঁদের বিনিয়োগে আনতে চাওয়াটা বুদ্ধিমানের চিন্তা নয়।’

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পই একসময় বড় আকারের শিল্প হয়। তবে সিলেটে সেটি হচ্ছে না। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা আছে বলে অভিযোগ করলেন ব্যবসায়ীরা। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ ক্ষুদ্র থেকে বর্তমানে মাঝারি শিল্পে পরিণত হয়েছে। তবে সেটিকে আরও বড় করার জন্য বিসিকে নতুন প্লট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলিমুল আহসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গোটাটিকর বিসিকে আমার ছয়টি প্লট আছে। আমার কারখানা বড় করা দরকার। কিন্তু বিসিক বলেছে, আমাকে আর প্লট দেওয়া হবে না।’

জানতে চাইলে সিলেট চেম্বারের সভাপতি সালেহ উদ্দিন আলী আহমদ স্বীকার করেন যে সিলেটে বড় শিল্প নেই। তিনি বলেন, এখানকার ব্যবসায়ীরা বড় পদক্ষেপ নিতে একটু ভয় পান। তবে শিগগিরই এই খরা কাটবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সিলেট চেম্বারের সভাপতি বলেন, সরকার সিলেট অঞ্চলে দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে যাচ্ছে। সিলেটের অনেক ব্যবসায়ীই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এখানে বিনিয়োগ করবেন। তা ছাড়া সিলেটের তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক ব্যবসায় ঝুঁকছে। তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে। আশা করা যায় এতে বিনিয়োগ বাড়বে।