মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

কার নিন্দা করো তুমি!



মারুফ কামাল খান:
আমি ধর্মবিশ্বাসী মানুষ হলেও উগ্র, সাম্প্রদায়িক কিংবা পরধর্মবিদ্বেষী নই। শান্তি, সাম্য, মৈত্রী, সৎকর্ম, ন্যায়বিচার – প্রায় সব ধর্মেরই সারকথা। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি কোনো ধর্মেরই উদ্দেশ্য নয় বলেই আমি মনে করি।
সম্প্রতি ফ্রান্সের ঘটনাপ্রবাহ, এর প্রতিক্রিয়ায় দেশে দেশে মুসলমানদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাক এবং এ সম্পর্কে বিভিন্ন মহলের মতামত আমি লক্ষ্য করছি। অনেকে প্রতিবাদের ধরণ ও বয়কট নিয়ে মত দিতে গিয়ে আসল সত্যকে আড়াল করে বহুল প্রচলিত কিছু কুযুক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে চাইছেন। আসল ক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে তারা প্রতিক্রিয়াকেই প্রধান করে তুলছেন। এ সম্পর্কে তাই কিছু বলা প্রয়োজন মনে করছি।
আমি প্রথমেই মহানবী(সা.) অবমাননার শোধ নিতে একজন শিক্ষককে গলা কেটে হত্যার নিন্দা করছি। আমার কাছে মনে হয়, এমন উগ্রতা ও নৃশংসতাকে আমাদের ধর্ম ও আইন কোনোটাই অনুমোদন করে না। কোনোক্রমেই এটি আমার বিবেচনায় শান্তির ধর্ম ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। মুসলমান সমাজকে এ ধরনের নৃশংসতা, উগ্রতা এবং আইন ও বিচার বহির্ভূত সন্ত্রাসকে বরাবর নিরুৎসাহিত করতে হবে।
বয়কট ধর্মবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পন্থা কিনা তা নিয়ে ডিবেট হতেই পারে। কিন্তু এই বিতর্কের অজুহাতে কোনো বিদ্বেষকেই সমর্থন করা যায় না। ফ্রান্সে যা ঘটছে এবং বিশ্বব্যাপী এর প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে মূলতঃ বিদ্বেষ থেকেই।
এক ফরাসী শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বুঝাতে গিয়ে যখন অনুসারীর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মের যিনি প্রবর্তক তাঁর ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে আসেন তখন সেই ধর্মপ্রবর্তকের প্রতি, সেই ধর্মের প্রতি এবং সেই ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তার বিদ্বিষ্ট মনেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অনেকের ধর্মীয় অনুভূতি যে এতে আহত হতে পারে তা জেনেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে তিনি এই কাণ্ডটি করেছেন তাদের অনুভূতির প্রতি তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা ও উপেক্ষা দেখিয়ে। অথচ আমরা সকলেই জানি যে, বহুমাত্রিক একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজে কোনো স্বাধীনতাই সীমাহীন নয়।
প্রতিটি নাগরিকেরই পথে ছড়ি ঘুরিয়ে চলার স্বাধীনতা আছে। তবে সে স্বাধীনতা আরেক জনের নাকের ডগা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কেননা, অক্ষত নাসিকা নিয়ে অন্য সকলের পথ চলার স্বাধীনতাও সুরক্ষিত রাখতে হয়। ফরাসী শিক্ষক নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চর্চা করতে গিয়ে অপরের ধর্মীয় অনুভূতি অক্ষত রাখার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন। এটা ছড়ি ঘোরাবার স্বাধীনতার চর্চা করতে গিয়ে অন্যের নাকে খোঁচা মারার শামিল। এই অপরাধকে অস্বীকার করা যায় না। তবে এরজন্য আইন ও বিচারের দ্বারস্থ না হয়ে তাকে মেরে ফেলাটাও অবশ্যই বাড়াবাড়ি এবং জঘন্য নিন্দনীয় এক অপরাধ।
ফরাসিরা তাদের অধিকৃত আলজিরিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন উপনিবেশের মানুষদেরকে মতপ্রকাশ সহ বিভিন্ন বিষয়ে কতটা স্বাধীনতা ও মর্যাদা দিয়েছে সে ইতিহাস নাই বা তুললাম। আগের প্রজন্মের ফরাসীদের অন্যায়-অপরাধের জন্য ফ্রান্সের বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী ও দোষী করতে চাইনা। তাদের অতীত এন্টি-সেমেটিক বা ইহুদীবিদ্বেষ এবং ক্রুসেডার ভূমিকার জন্যও হালের ফরাসীদের দোষারোপ করছি না। এই ফ্রান্স আয়তুল্লাহ্ রুহুল্লাহ্ খোমেনির মতন শিয়া মুসলিম ধর্মগুরুকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দিয়েছিল, সেটাও আমরা জানি। সেখানে নির্বাসিত থেকেই তিনি ইরানের শাহেনশাহের শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংঘটিত করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ফরাসীরাই আবারো ধর্মবিদ্বেষের বিষাক্ত অতীতের দিকে যে ভাবে ক্রমাগত ঝুঁকে পড়ছে তাতে উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ আছে। এখন পরধর্মবিদ্বেষী উগ্র ডানপন্থী সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন লোকের ক্রমাগত সংখ্যাবৃদ্ধিই ফ্রান্সের সরকার, প্রশাসন ও রাজনীতিকে দ্রুতগতিতে ঠেলে দিচ্ছে এই পরিণতির দিকে। এতে ফ্রান্সের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকেরা পুরোপুরি বিপন্ন হতে চলেছেন।
ইসলামের নবীকে (সা.) ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে হেয় করার শোধ নিতে কৈশোরোত্তীর্ণ এক ছাত্র গলাকেটে হত্যার মতন যে পৈশাচিকতার আশ্রয় নেয়, তা রীতিমত হৃদকম্প সৃষ্টির মতন ব্যাপার নিঃসন্দেহে। বিচার বহির্ভূত এমন খুন-খারাবি বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজে এ নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সন্ত্রাস ও হত্যার দায়ে সেই কিশোর অপরাধীর বিচার না করে বিনাবিচারে অকুস্থলেই তাকে গুলী করে মেরে ফেলাটাও কিন্তু নিন্দনীয় এবং এর মাধ্যমেও বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে।
এ ধরণের ঘটনার প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার যে-কোনো সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের অবশ্যই আছে। কিন্তু এই ঘটনার জন্য ফ্রান্সের ও সারা দুনিয়ার তাবৎ মুসলমান তো দায়ী বা দোষী নয়। কাজেই ফ্রান্সে শিক্ষক হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুনিয়ায় অগণিত শান্তিবাদী মুসলমান, যারা কোনো অপরাধ করেনি তাদের প্রিয় নবীর ব্যঙ্গচিত্রের ব্যাপক প্রদর্শনীর অনুমতি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে তা প্রচার করাটা কি বিদ্বেষপ্রসূত নয়? যা প্রদর্শন করার প্রতিক্রিয়ায় একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটে গেলো, সে ব্যাপারে সাবধান না হয়ে তা আরো ব্যাপকভাবে প্রদর্শনের অনুমতি দেয়াটা সমাজে নৃশংস অপরাধপ্রবণতাকেই উস্কে দেয়া নয়-কি? এটাকে কি দায়িত্বশীলতা বলা চলে?
অপরাধ করেছে একটি কিশোর। কিন্তু তাকে বিনাবিচারে হত্যা ও তার স্বজনদের গ্রেফতারের পরেও শান্তি দেয়া হচ্ছে সারা দুনিয়ার নির্দোষ অগণিত মুসলমানকে তাদের অনুভূতিতে ঘটা করে আঘাত করার মাধ্যমে। তাদের নবী(সা.) অনেক আগে ইন্তেকাল করেছেন এবং তিনি ফ্রান্সের বর্তমান সমাজে কোনো আইনভঙ্গও করেননি। অথচ তাঁকেই ফ্রান্স সরকার বিদ্রুপ ও অপমানের বিষয়বস্তু বানিয়ে জনসমক্ষে প্রচার করার খোলা ছাড়পত্র দিয়েছে। এই ধরণের কার্যকলাপ কোনো যুক্তির মাধ্যমে নয়, কেবল শক্তির জোরেই চালানো হচ্ছে।
মুসলমান ছাড়াও বিশ্বের প্রতিটি অসাম্প্রদায়িক ও উদারনৈতিক সচেতন মানুষের কর্তব্য হচ্ছে, ফরাসী সরকার, প্রশাসন ও রাষ্ট্রপ্রধানের বিদ্বিষ্ট এই ঘৃণ্য মানসিকতার নিন্দা করা। তাদের এসব পদক্ষেপকে কোনো বিবেচনায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে মানা যায় না। চরম বিদ্বেষপ্রসূত কোনো ক্রিয়ার নিন্দা না করে এর প্রতিক্রিয়াকে ভারসাম্যহীন, মাত্রাছাড়া ও উগ্র বলে নিন্দা করাটাও কিন্তু খুব একদেশদর্শী ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক