বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম

ঈমান ফতুর করা চতুর কাণ্ড



মারুফ কামাল খান:

সাভারের রানাপ্লাজা ট্রাজেডি এবং এ-নিয়ে সরকারের ‘পিলার নাড়ানাড়ি তত্ত্ব’ যখন মানুষের অশ্রু, বেদনা, শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদকে জমাট বাধিয়ে পাথর করে তুলছিল তখনই মঞ্চে এসেছিল মহাচমকের এক নতুন এপিসোড : রেশমা উদ্ধার পর্ব।
মানুষ সব ভুলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্যাট টিভিগুলোর পর্দায় লাইভ সম্প্রচার দৃশ্যের সামনে। সেই মরণকূপ থেকে রেশমাকে যখন টেনে বার করা হয় তখন আবেগে উচ্ছ্বাসে বাষ্পরুদ্ধ মানুষ ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পাব্লিক, সৈন্য, পুলিস সবাই সমস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে খোদার দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে থাকে তাঁর এই কুদরতি মহিমার জন্য। এটা যে আসলে আল্লাহ্’র সচতুর বান্দার অতি সুপরিকল্পিত জাল-জোচ্চুরিও হতে পারে, সহজ সরল ঈমানদার লোকেদের মনে সেই সন্দেহ ঘূর্ণাক্ষরেও কিন্তু তখন উঁকি দেয় নাই।
তবে সকলেই তো আর সমান ঈমানদার নয়। যেমন ধরুন মুন্নী সাহা। তার বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা ও ইমেজ সংকট তো বরাবরই আছে। তবে অবিশ্বস্ত মানুষও কিন্তু কখনো কখনো অন্তরালের সত্যকে তুলে আনতে পারে। সে-সময় মুন্নী অবিশ্বাসের সুর নিয়ে টিভি পর্দায় হাজির হয়েছিলেন। ভিক্টিম সহ উদ্ধার কাজে শরিক এবং সে অভিযান পরিচালনা ও তদারকিতে জড়িতদেরকে নানান রকম কঠিন প্রশ্ন করছিলেন। তার কসরৎ ছিল সেই উদ্ধার-পর্বকে সাজানো নাটক ও হাস্যকর প্রমান করার।
সে-সময় আমি অধিকাংশ দর্শক-স্রোতাকে মুন্নীর ওই ভূমিকায় বেজায় ক্ষিপ্ত দেখেছি। অলৌকিকতার আবেশমাখানো ঘটনাটি তখন সবখানে সবার মুখে মুখে। সেই সঙ্গে তুঙ্গে ছিল মুন্নীবিরোধী ক্ষোভ।
এক নাগরিক আড্ডায় একজন আমাকে প্রশ্ন করলেন : ওই মাইয়া খেপছে ক্যান জানেন?
আমি জানিনা বুঝাতে দু’দিকে ঘাড় নাড়ালাম। তিনি বিজ্ঞের হাসি দিয়ে বললেন : উদ্ধারটা মিলিটারিরা করছে তো। তাই ওর সহ্য হইতেছে না।
আরেক মুরুব্বি ধমক দিয়ে বললেন : দূর মিয়া, কী-সব আন্দাজে কথা ক’ন। আসলে আল্লাহু আকবার শুইনা ওর গা জ্বলতাছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে পুরনো এক পত্রিকার মাঝবয়েসী সহকারী সম্পাদকও বললেন, যাই বলেন এরকম সময়ে একজন ভিক্টিমকে এভাবে জেরা করাটা জার্নালিস্টিক ইথিক্সের মধ্যে পড়ে না।
আরেক তরুণ কবি রাগতঃস্বরে বললেন, আগুনের মধ্যে ফালাইয়া তারপর মুখের সামনে বুম ধইরা মুন্নীরে জিগানো দরকার, আপনার এখন প্রতিক্রিয়া কী?
কাঁচাবাজারে গিয়েও শুনি একই আলোচনা। একজন অঙ্গভঙ্গি সহকারে অনুপস্থিত মুন্নীর উদ্দেশে খিস্তি করে বলছিলেন, এদের হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে বর্ডারের ওপারে ফেলে দিয়ে আসা দরকার।
মুন্নীর সেদিনকার ভূমিকার পেছনের উদ্দেশ্য আমার জানা নেই। কোনো কারণে প্ররোচিত হয়ে, নাকি কোনো তথ্য পেয়ে, কিংবা কাউকে খাটো করার উদ্দেশে, নাকি প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্যই সেদিন এমন অবস্থান নিয়েছিলেন – সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে তার সে অবস্থান সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। আগে থেকেই তার ক্রেডিবিলিটির
সংকট থাকায় তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াটা বেশি তীব্র হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাকে নিয়ে এন্তার ট্রল হয়েছিল।
পরে রেশমাকে নিয়ে কর্তৃপক্ষের খুব বেশি রাখঢাক এবং একের পর এক রহস্যময় আচরণ ও বক্তব্যে মানুষের আবেগ ফিকে হয়ে আসে, বিশ্বাসের ভিত টলে যায়। উদ্ধারের সময় রেশমার চকচকে পোশাক, সতেজ অবয়ব, প্রসাধনীর ছোপ এবং আরো অস্বাভাবিক নানা
আলামত তখন তাদের চোখে পড়তে থাকে। দৃষ্টিকটু মনে হতে থাকে বিভিন্ন অসঙ্গতি। আস্তে আস্তে সকলের কাছেই রেশমা উদ্ধার পর্বকে পুরোপুরি সাজানো একটা এপিসোড বলেই মনে হতে থাকে। অনেকেই এখন সন্দেহ করেন, এটা ছিল গুরুতর পরিস্থিতি থেকে সরকারকে উদ্ধার করার জন্য এক জেনারেল সাহেবের সাজানো নাটক। পরবর্তীকালে খুবই নাটকীয় ভাবে তাকেও নাকি ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে।
ভূতপূর্ব সেই জেনারেল সাহেব নাকি এখন সরকারের ওপর খুবই খাপ্পা। আর মুন্নী এখন অতি তৎপর তার ‘সরকার-উদ্ধার সাংবাদিকতা’র কাজে।
রেশমা উদ্ধারের প্রতীকী ঘটনার মাধ্যমে সরকার উদ্ধারের নাটক এদেশের মানুষের বিশ্বাস ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন তারা আর ডুবে যাওয়া লঞ্চের গুপ্ত এয়ার পকেট বা ভ্যাকুয়াম চেম্বারে ১৩ ঘন্টা আটকে থাকা যাত্রীকে জীবন্ত উদ্ধারের ‘সত্য ঘটনা’ও বিশ্বাস করতে চায় না। শোচনীয় মৃত্যু থেকে তাদের অ্যাটেনশন এসব কুদরতি ঘটনার দিকে ডাইভার্ট করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আল্লাহ্’র কুদরতের কথা বললেও লোকের মনে এই সংশয় উজিয়ে ওঠে যে, এর পেছনে কোনো চতুর বান্দার কারসাজি নেই তো? চমকে ভরা এই নাটুকে রাজ্যে কিছুতেই যে আর বিশ্বাস নেই!
ইয়া রাব্বুল আলামীন! আমাদের ঈমান ফতুর করা এই চতুরদেরকে যা করার তা আপনিই করুন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক